ট্রাম্পের বিপদ ডেকে আনছে মুসলিমবিদ্বেষ ?

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থী ডোনাল্ড ট্রাম্প অভিবাসী ও মুসলিমদের বিষয়ে নেতিবাচক বক্তব্যের কারণে ইতিমধ্যে ব্যাপকভাবে সমালোচিত। সেই অবস্থান তাঁকে দেশের মুসলিম জনগোষ্ঠী ও অভিবাসীসহ অনেকের কাছেই অপ্রিয় করে তুলেছে। এ পরিস্থিতিতে মুসলিমদের নিয়ে নতুন করে ইঙ্গিতপূর্ণ কথা বলায় আবার তোপের মুখে পড়েছেন ট্রাম্প। অভিবাসী মুসলিম খিজির খান ও তাঁর স্ত্রীর প্রতিবাদী বক্তব্য রিপাবলিকান পার্টির প্রার্থীর প্রতি বড় চ্যালেঞ্জ হয়েই এসেছে এবার।
খিজির খান ট্রাম্পকে শুধু সাধারণ সৌজন্যবোধ শেখাচ্ছেন না, নেতা হতে হলে যে সহানুভূতি ও মমত্ববোধ থাকতে হয়, সে শিক্ষাও যেন দিচ্ছেন। অনর্গল কথা বলায় অভ্যস্ত ট্রাম্প এখন খিজির খান ও তাঁর স্ত্রী গাজালা খানের সোজাসাপটা কথার সামনে বেহাল হয়ে কথা বলা প্রায় বন্ধ করেছেন।
পাকিস্তানে জন্ম নেওয়া খিজির খান সপরিবারে যুক্তরাষ্ট্রে আসেন সত্তরের দশকে। তাঁর ছেলে হুমায়ুন খান মার্কিন সেনাবাহিনীর ক্যাপ্টেন ছিলেন। ২০০৪ সালে ইরাকে সামরিক দায়িত্ব পালনকালে নিহত হন তিনি। আর এই হুমায়ুনকে কেন্দ্র করেই জমে উঠেছে ট্রাম্প-খান বিতর্ক।
প্রার্থিতার প্রচারণার শুরু থেকেই ডোনাল্ড ট্রাম্প মুসলিমবিদ্বেষী কথা বলতে থাকেন। দলীয় মনোনয়ন পাওয়ার পর এই বিদ্বেষপূর্ণ কথার ফুলঝুরি একটু কমে এসেছিল। কিন্তু গত সপ্তাহে ডেমোক্রেটিক পার্টির সম্মেলনের শেষ দিনে খিজির খানের বক্তব্যের পর স্বরূপে হাজির হন ট্রাম্প। ওই সম্মেলনে ট্রাম্পের মুসলিমবিদ্বেষী অবস্থানের সমালোচনা করেন খিজির খান। এ সময় তাঁর স্ত্রী গাজালা খান পাশে ছিলেন। তিনি সে সময় কোনো কথা বলেননি। ট্রাম্প খিজিরের সমালোচনার জবাব দিতে গিয়ে গাজালার নীরবতা সম্পর্কেও কটাক্ষ করেন। দৃশ্যত মুসলিম সংস্কৃতির দিকে ইঙ্গিত করে ট্রাম্প বলেন, গাজালাকে হয়তো কথাই বলতে দেওয়া হয়নি।
যুদ্ধক্ষেত্রে নিহত একজন সেনার পরিবারের সদস্যদের নিয়ে এমন মন্তব্য করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েন ট্রাম্প। রাজনীতিক ও সাবেক সেনাসহ অনেকেই সোচ্চার হন নিন্দায়।
সিএনএনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে খিজির খান বলেন, ‘আমরা এমন একজন নেতা চাই যিনি দেশের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করবেন, তাঁদের বিভক্ত করবেন না।’ রিপাবলিকান দলের নেতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ‘যথেষ্ট হয়েছে, এখন আপনাদের উচিত মুখ খোলা। উদ্ধত ও মূর্খ এই লোকটি নারীদের, দেশের বিচারকদের, বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষের নিয়ে অসম্মানজনক কথা বলেছেন।’
ট্রাম্পের রিপাবলিকান দলের অনেক নেতাই খিজির খানের এই পরামর্শ গ্রহণ করা শুরু করেছেন। তাঁদের একজন সিনেটর ম্যাককেইন কঠোর ভাষায় ট্রাম্পের সমালোচনা করে বলেন, ট্রাম্প একজন বীর সৈনিকের পরিবারকে যে ভাষায় আক্রমণ করেছেন, তা গ্রহণযোগ্য নয়। ম্যাককেইন বলেন, ‘আমি জোর দিয়ে বলতে চাই, ট্রাম্পের কথার সঙ্গে আমি সম্পূর্ণ ভিন্নমত পোষণ করি। তিনি যা বলেছেন তা রিপাবলিকান পার্টি বা এর প্রার্থীদের মতের প্রতিনিধিত্ব করে না।’
ট্রাম্পের বক্তব্যের প্রতিবাদ করেছেন যুদ্ধফেরত সামরিক বাহিনীর সাবেক সদস্যরাও। ট্র্যাজেডি অ্যাসিস্ট্যান্স প্রোগ্রাম ফর সারভাইভারস নামে একটি সেনাকল্যাণ-বিষয়ক প্রতিষ্ঠান এক বিবৃতিতে ট্রাম্পের বক্তব্যের নিন্দা করে বলেছে, যারা দেশের কর্তৃত্ব ভার নিতে চায়, তাদের পর্যাপ্ত চারিত্রিক যোগ্যতা থাকা প্রয়োজন। ভেটারান্স অব ফরেন ওয়ারস নামের একটি সংস্থা ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘অসহ্য’ বলে নিন্দা করেছে।
ওয়াশিংটন পোস্ট-এর একজন ভাষ্যকার প্রশ্ন করেছেন, ট্রাম্প লোকটা কি পাগল নাকি?
খান পরিবার নিয়ে দ্বন্দ্ব ছাড়াও রাশিয়া ও দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের প্রতি উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ট্রাম্প রক্ষণশীল রিপাবলিকান সদস্যদের সমালোচনার শিকার হয়েছেন। সিআইয়ের সাবেক পরিচালক জেনারেল হেইডেন ট্রাম্পের বক্তব্যকে ‘অসংযত ও উচ্ছৃঙ্খল’ হিসেবে বর্ণনা করেন।
শুধু রাজনীতিক ও বিশেষজ্ঞেরাই নন, ট্রাম্পের প্রতি সাধারণ ভোটারদের মধ্যেও অসন্তোষ বাড়ছে। সে কথার প্রমাণ মিলেছে গত দুই দিনে প্রকাশিত একাধিক জনমত জরিপে। এর মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য গ্যালপ-এর প্রকাশিত সর্বশেষ জনমত জরিপ। গ্যালপ জানাচ্ছে, ৫১ শতাংশ মানুষ বলেছেন, তাঁরা ট্রাম্পের পক্ষে ভোট দেবেন না। মাত্র ৩৬ শতাংশ মানুষ তাঁর পক্ষে ভোট দেওয়ার কথা জানিয়েছে। গ্যালপের গৃহীত এই জরিপ অনুসারে, রিপাবলিকান-সমর্থকদের মধ্যে ৮ শতাংশ জানিয়েছে, তাঁরা ট্রাম্পের বদলে হিলারি ক্লিনটনকে ভোট দেবেন। অন্যদিকে ডেমোক্রেটিক পার্টির সমর্থকদের মাত্র ২ শতাংশ জানিয়েছেন, তাঁরা হিলারিকে নন, ট্রাম্পকে ভোট দেবেন।
সিএনএনের আরেক জরিপ অনুযায়ী, ডেমোক্রেটিক সম্মেলন শেষে হিলারি তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী ট্রাম্পের চেয়ে ৯ শতাংশ এগিয়ে। জরিপে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে ৫২ শতাংশ হিলারিকে ও ৪৩ শতাংশ ট্রাম্পকে সমর্থন করেন বলে জানিয়েছেন।

উৎসঃ প্রথম আলো

Leave a Reply

Go Top
%d bloggers like this: