যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক এখন ‘নির্ঘুম নগরী’

ইব্রাহীম চৌধুরী, নিউইয়র্ক

যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ককে বলা হয় ‘নির্ঘুম নগরী’। নিত্য জেগে থাকা এ নগরীর কর্ম পাগল মানুষ ঘুমায়। শুধু নির্ঘুম রাত কাটান আমাদের কিছু প্রবাসী। নিউইয়র্কের বাংলাদেশি অধ্যুষিত জ্যাকসন হাইটসে গেলে দেখা মেলে একদল প্রবাসীর। যারা কাজ-কর্ম পরিবার রেখে মেতে উঠেছেন আড্ডায়। তর্ক-বিতর্কে রাতভর সরগরম হোটেল রেস্তোরাঁ। আওয়ামী লীগ, বিএনপি আর নানা রঙের সমিতি সংগঠন নিয়ে এসব প্রবাসীর দিন কাটে ঘুমিয়ে। রাত কাটে কোলাহল জ্যাকসন হাইটসে।

এবারের গ্রীষ্মের আবহাওয়ায় চলমান আড্ডা আর ঝগড়াঝাঁটি অনেকটাই দলীয় হয়ে উঠেছে। আওয়ামী লীগ আর বিএনপির লোকজনের জম্পেশ কোলাহলে যেন চাপা পড়ে যাচ্ছে অন্য সবকিছু। আওয়ামী লীগ সভানেত্রী এবং প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেপ্টেম্বরে নিউইয়র্ক আসছেন। জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে যোগ দিতে তিনি বরাবরের মতো সাত দিনের জন্য সফরসঙ্গী নিয়ে নিউইয়র্কে আসছেন। তাঁর এ আগমন নিয়ে এর মধ্যেই শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের দলাদলি আর কোন্দল। সন্ধ্যা রাত থেকে ভোর পর্যন্ত জ্যাকসন হাইটসে সভা চলছে। রাত ১২টার দিকে দোকানপাট সব বন্ধ হলেও দেখা যাবে বাংলাদেশি রেস্তোরাঁগুলো খোলা। কেউ হলুদ ট্যাক্সি থামিয়ে, কেই গ্রিন ট্যাক্সি থামিয়ে ঢুকছেন খাবার বাড়ি, মেজবান, প্রিমিয়াম নামের রেস্তোরাঁয়।

নানা দলে উপদলে বিভক্ত আওয়ামী লীগের লোকজন মেতে ওঠেন তাদের সম্মেলন হবে কি না, এমন জল্পনায়। চার বছরের পুরোনো কমিটির বদলে নতুন কমিটি হবে এমন আলোচনায় মেতে আছেন একটি অংশ। কমিটি হলে কে কোন পদে যাবেন, এ নিয়ে চলছে নানা সমঝোতা। আগের কমিটিতে যারা নেতৃত্বে আছেন, তাঁরা চাচ্ছেন না নতুন কোন কমিটি হোক। তারা বলছেন, এবারে নেত্রী আসবেন অল্প সময়ের জন্য। নতুন কমিটি গঠনে তার সময় নেই। কমিটি না হলে তাদের নেতৃত্ব অটুট থাকবে এবং এর জন্য কমিটির দাবিকে দমিয়ে রাখার কাজটি করছেন তাঁরা।

গত শুক্রবার জ্যাকসন হাইটসে দেখা গেল মধ্য রাত পেরিয়েও যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের প্রেসিডেন্ট সিদ্দিকুর রহমান সস্ত্রীক উপস্থিত প্রিমিয়াম রেস্তোরাঁয়। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্র আওয়ামী লীগের আপাত বহিষ্কৃত সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদুর রহমান ছিলেন তাঁর সমর্থকদের নিয়ে পাশের ‘খাবার বাড়ি’তে। এর মধ্যে যুবলীগের বিবাদমান দুই গ্রুপের লোকজনের তর্ক আর দলাদলিতে যেন রীতিমতো উৎসব।
যুক্তরাষ্ট্র শাখা আওয়ামী লীগের জনসংযোগ সম্পাদক কাজী কয়েস প্রথম আলোকে জানান, রাত জেগে নানা কর্মকৌশল নিয়ে তাঁরা আলাপ করেন। ক্ষমতায় থাকা দলের মধ্যে নানা দল, উপদল থাকে। এসব সামাল দিয়ে ঐক্য ধরে রাখার জন্যই এসব রাত পেরোনো আলাপ।
দলের অপর নেতা রহিম বাদশাহ জানান, নতুন কমিটি হলে যোগ্য এবং নিবেদিতরা যাতে সঠিক পদ পায়, এ নিয়েই চলছে যত সব আলোচনা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক অপর একজন জানালেন, সংবর্ধনা সভায় নেত্রীর কাছাকাছি কীভাবে যাবেন বা যাওয়ার সুযোগ পাবেন, তা নিয়েও চলছে নানা আলোচনা।

new york report 2

বিএনপির আড্ডায় চলছে সুনসান নীরবতা
এদিকে জ্যাকসন হাইটসে বিএনপির আড্ডায় চলছে সুনসান নীরবতা। হঠাৎ করে ঢাকায় বিএনপির কমিটি ঘোষণা করা হয়েছে। এ কমিটিতে প্রবাসে থাকা অনেকের নাম থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র থেকে কোন বিএনপি নেতার নাম নেই।
নিউইয়র্কে বিএনপির লোকজন মনে করেন, তাদের প্রতি কেন্দ্র থকে চরম উদাসীনতা দেখানো হয়েছে। দল খুব ভারী না হলেও বিএনপির লোকজন নিয়মিতই সরকার বিরোধী নানা কর্মসূচি পালন করে থাকেন। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী যখন জাতিসংঘ অধিবেশনে আসেন তখন নানা উপদলে বিভক্ত বিএনপির লোকজন এক হয়ে জাতিসংঘ সদর দপ্তরের সামনে এবং বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর আগমনের সময় প্রতিবাদ সমাবেশ করে থাকেন।
আবদুল লতিফ সম্রাট এবং জিল্লুর রহমানের নেতৃত্বে যুক্তরাষ্ট্র শাখা বিএনপির দুটি পক্ষ রয়েছে। সন্ধ্যায় তারাও আসেন জ্যাকসন হাইটসে। ‘প্রিমিয়াম’ বা ‘খাবার বাড়ি’ রেস্তোরাঁয় দলাদলি আর কোন্দল নিয়ে চলে আলোচনা। সম্প্রতি রাজ্য কমিটি গঠন নিয়ে প্রকাশ্য রাজপথে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন বিবাদমান দুই পক্ষ। পুলিশকে সংঘর্ষ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। গত সপ্তাহান্তে দেখা গেছে সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসলেই বিএনপির লোকজন জ্যাকসন হাইটস ছাড়ছেন।
বিএনপি নেতা জসিম ভূঁইয়া বলেছেন, আমরা হাজার হাজার ডলার খরচ করে প্রবাসে দল করি। দলের কেন্দ্রীয় কমিটি গঠনের সময় তাদের মূল্যায়ন করা হয়নি বলে তিনিসহ অন্যরা ক্ষুব্ধ বলে জানান। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিএনপির এক নেতা প্রথম আলোকে জানান, প্রতি বছর প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতিতে আমরা প্রতিবাদ সমাবেশ করি। আমাদের কাজ কর্ম রেখে এ সময়টিতে আমরা কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য সভা ও কৌশল ঠিক করি। এবারে হতাশ নেতা কর্মীদের সন্ধ্যার পর আর পাওয়া যাচ্ছে না বলে তিনি জানান।
বিএনপি নেতা জিল্লুর রহমান প্রথম আলোকে জানান, পরিবার রেখে, কাজ রেখে আমরা দলের জন্য সময় দিই। দল আমাদের কি দিয়েছে, তা না দেখেই হয়তো কাজ করে যেতে হবে।

শুধু বাংলাদেশের রাজনীতি নিয়েই জমে থাকেন না রাত জাগা এসব স্বদেশিরা। আমেরিকার লোকজন প্রকাশ্যে রাজনীতি নিয়ে কোন উচ্ছ্বাস আলোচনা তেমন দেখা যায় না। তবে আমাদের এসব প্রবাসীদের রাতভর হিলারি আর ট্রাম্পকে নিয়ে মেতে থাকতে দেখা যায়। রিপাবলিকান বিমুখ আমাদের প্রবাসীরা দেখছেন হিলারির পালে হাওয়া বাড়ছে। নানান সৃজনশীল চিন্তায় হিলারিকে নিয়ে আমাদের প্রবাসীরা বিভোর।
আওয়ামী লীগের লোকজন বলছেন তাঁরা হিলারির সমর্থনে মাঠে নামবেন। এ নিয়ে বাংলা সংবাদমাধ্যমে সংবাদ কীভাবে করানো যায় এ নিয়ে চলে নানা কৌশলী আলোচনা।
এদের টেক্কা দিতে বিএনপি আবার ঘোষণা দিয়েছে, হিলারির সমর্থনে তাঁরা সমাবেশ করবেন। বিএনপির সাবেক মন্ত্রী এহসানুল হক মিলন উপস্থিত থাকবেন, এমন ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। বিএনপি এসব কর্মসূচি বাতিল করেছে বলে জানানো হয়েছে।
বিশ্বের অন্য কোনো অভিবাসীদের এমন কোনো তৎপরতা দেখা না গেলেও রাজনীতি নিয়ে সদা মত্ত প্রবাসীদের মধ্যে উচ্ছ্বাসের কোন শেষ নেই। অনেক ক্যাব চালক, রেস্তোরাঁ কর্মী তাদের পরিবারে জন্য কোন সময় না দিয়েই এসব করছেন। কাজে ফাঁকি দিয়ে, কাজ না করে, স্ত্রী সন্তানকে একা ফেলে নেশার মতো সময় কাটাচ্ছেন একদল প্রবাসী।

সময়জ্ঞান, কাজ আর দ্রুততার দেশ আমেরিকায় এসেও আমাদের নির্ঘুম একদল প্রবাসীর কর্মকাণ্ড অনেকের কাছে রীতিমতো হাস্যকর। এদের এসব কর্মকাণ্ডের নানা প্রভাব পড়ছে তাদের পরিবার এবং অভিবাসী হিসাবে বাংলাদেশিদের ভাবমূর্তিতে।

Leave a Reply

Go Top
%d bloggers like this: