এক টাকায় করিডোর

গত ১৮ জুলাই ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে বাংলাদেশের স্বার্থ বিকিয়ে দেয়ার মতো আরো একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। বাংলাদেশের সড়ক ও জনপথ অধিদফতরের সাথে ভারতের ইন্ডিয়ান অয়েল করপোরেশনের (আইওসিএল) স্বাক্ষরিত এ চুক্তির অধীনে ভারত বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পেট্রল, ডিজেল ও গ্যাস ভারতের এক রাজ্য থেকে আরেক রাজ্যে নিয়ে যেতে পারবে। দেশটির উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় আসাম থেকে ওই সব পণ্য তারা নেবেন ত্রিপুরায়। প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৮০টি ট্যাংক-লরি যাবে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে। চুক্তিতে বলা হয়েছে, প্রতিটি লরিতে থাকবে সাত টন করে জ্বালানি। বলা হয়েছে, ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ভূমিধসের কারণে আসাম থেকে ত্রিপুরাগামী সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ত্রিপুরার সাথে ভারতের অন্যান্য অঞ্চলের যোগাযোগব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। ফলে ত্রিপুরা রাজ্যে জ্বালানিসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের তীব্র সঙ্কট দেখা দিয়েছে। এ কারণে মানবিক দিক বিবেচনা করে ভারতকে সাময়িক ট্রানজিট সুবিধা দিয়েছে বাংলাদেশ। গত ৭ সেপ্টেম্বর থেকে এই পরিবহন কাজ শুরু হয়েছে। আর এই পণ্য পরিবহনের জন্য বাংলাদেশ প্রতি টনে মাশুল নেবে মাত্র এক টাকা দুই পয়সা। উল্লেখ্য, বাংলাদেশে ভিক্ষুকেরাও অনেকে এক টাকা কেন, দুই টাকাও ভিক্ষা নেয় না আজকাল।

চুক্তি অনুযায়ী ভারতের জ্বালানিবাহী লরিগুলো ডাউকি-তামাবিল সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। তারপর বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ১৪০ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে পৌঁছবে ত্রিপুরায়। এই ব্যবস্থা আপাতত সেপ্টেম্বর মাসজুড়ে চলবে। ত্রিপুরার রাজ্য সরকার জানিয়েছে, ঢাকা সরকার মানবিক কারণে দিল্লি সরকারের এই অনুরোধে সাড়া দিয়েছে। ভারত যখন কোনো কারণেই তিস্তার পানিচুক্তি করতে রাজি নয়, যখন ফারাক্কার সবগুলো গেট খুলে দিয়ে বাংলাদেশের বিরাট অঞ্চল ডুবে যাওয়ার অবস্থা সৃষ্টি করেছেÑ সে সময় এমন একটা ‘মানবিক’ আহ্বান বাংলাদেশের জন্য আসলে কতটা মানবিক? আবার বাংলাদেশ সরকার দেশের স্বার্থবিরোধী এ রকম একটি চুক্তি করেছে বলতে গেলে অতি সঙ্গোপনে। চুক্তির বিস্তারিত বিবরণও সাধারণ মানুষকে জানতে দেয়া হয়নি। কেন? ত্রিপুরা রাজ্য সরকার বলেছে, তারা এই সড়ক এর মধ্যে পর্যবেক্ষণও করেছেন। ট্যাংক-লরির চালক ও হেলপারদের ভিসাও দেবে বাংলাদেশ। ঢাকায় নিযুক্ত ভারতীয় হাইকমিশনার গত মাসে বলেছেন, ভারী বৃষ্টিতে ত্রিপুরার রাস্তাঘাট খারাপ হয়ে যাওয়ায় বাংলাদেশের ওপর দিয়ে পণ্য পরিবহনের এই ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে। বৃষ্টিতে বাংলাদেশের রাস্তাঘাটের অবস্থাও করুণ। এর সচিত্র প্রতিবেদন প্রায় প্রতিদিনই সংবাদপত্রে ছাপা হচ্ছে। ভারতীয় এই বিপুলসংখ্যক ট্যাংক-লরি চলাচলে বাংলাদেশের এসব রাস্তা যানবাহনের জন্য একেবারেই অনুপযুক্ত হয়ে পড়বে। ভারত দেবে টনপ্রতি এক টাকা দুই পয়সা। আর আমাদের খরচ হবে লাখ লাখ টাকা। ভারতের সুবিধার জন্য বাংলাদেশের মানুষ কেন এই বিপুল অঙ্কের অর্থ গচ্চা দেবে?

চুক্তি অনুযায়ী, বাংলাদেশ ভারতকে সেপ্টেম্বরজুড়ে এই সুবিধা দেবে। কিন্তু এ রকম পরিস্থিতির উদ্ভব আবারো হলে আবারো ভারতকে এই সুবিধা দিতে হবে। পত্রপত্রিকার রিপোর্ট অনুযায়ী, এ ধরনের পণ্য পরিবহন করতে চাইলে উভয় দেশের মধ্যে নতুন চুক্তির দরকার হবে। কারণ বর্তমানে দুই দেশের মধ্যে শুধু আশুগঞ্জ বন্দর ব্যবহার করে পণ্য পরিবহনের নৌ-ট্রানজিট চুক্তি রয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে, উভয় দেশ তেমন একটি চুক্তি করারও প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু অনেকেই মনে করেন, আসলে সড়কপথে ট্রানজিট-করিডোর ব্যবস্থাও এর মাধ্যমে চালু হয়ে গেল। জনগণ মনে করে, বাংলাদেশ সরকারের ভারতপ্রীতি এতই উথলানো যে, এ ধরনের চুক্তির ক্ষেত্রে যে আন্তর্জাতিক মানের মাশুল আদায় করতে হয়; তারা যেন সেটা ভুলেই গেছেন। তবে এটা কিছুতেই বোধগম্য নয় যে, কিভাবে বাণিজ্যিক তৎপরতা বিনামূল্যে চলতে পারে। এখন প্রশ্ন উঠছে, আসলে বাংলাদেশ সরকারের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে ভারত ‘বন্ধুত্বমূলক চাপ’ সৃষ্টি করে এসব সুবিধা আদায় করে নিচ্ছে। কোনো কোনো সরকারি বাক্যবাগীশ সব সময় বলতে চান, বাংলাদেশও একই সড়ক ট্রানজিটের মাধ্যমে নেপাল ও ভুটানে ব্যবসা করে লাভবান হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘকাল ধরে এ ব্যাপারে আলোচনা চললেও ভারতের সড়ক ব্যবহার করে বাংলাদেশ কোনো পণ্য ওই দুই দেশে রফতানি করতে পারেনি আজ পর্যন্ত। আলোচনা চলছে তো চলছেই।

এর আগে ভারতের সরকারি সংস্থা ফুড করপোরেশন অব ইন্ডিয়া বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ‘মানবিক কারণে’ ৩৫ হাজার টন চাল অন্ধ্র প্রদেশ ও কলকাতা থেকে নিয়ে গেছে। সে চাল আশুগঞ্জ নৌবন্দরে খালাস করে বাংলাদেশী ট্রাকে করে আগরতলার নন্দননগর গুদামে পৌঁছে দেয়া হয়। তারও আগে ১৯১২ সালে ভারতের সরকারি সংস্থা অয়েল অ্যান্ড ন্যাচারাল গ্যাস করপোরেশন ‘মানবিক কারণ’ দেখিয়েই ৭২৬ মেগাওয়াটের পালাটানা বিদ্যুৎকেন্দ্রের জন্য আশুগঞ্জ বন্দর দিয়ে ভারী যন্ত্রপাতি, টারবাইন বয়ে নিয়ে যায় বাংলাদেশের সড়কগুলো ব্যবহার করে। তার জন্য ভারত কোনো মাশুল দেয়নি। উপরন্তু তিতাস নদীর মাঝ বরাবর রাস্তা নির্মাণ করে নদীটি বন্ধ করে দিয়ে তার ওপর দিয়ে এসব যন্ত্রপাতি নিয়ে যাওয়া হয়। ফলে ওই এলাকার কৃষি, পরিবহন ও মানুষের জীবন-জীবিকা ব্যাপকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে। আর এসব ভারী যন্ত্রপাতি বহন করার পরে বাংলাদেশের সড়কগুলো একেবারে খানাখন্দে পরিণত হয়ে যায়। ত্রিপুরার খাদ্য ও বেসামরিক পরিবহনমন্ত্রী ভানুলাল সাহা গত ৫ সেপ্টেম্বর বলেছেন, এলপিজি বোতলজাত করার জন্য যে প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে, বাংলাদেশের বন্দর ও সড়কগুলো ব্যবহারের ফলে সে প্রকল্পের কাজ অনেক সহজ হয়ে আসবে। তিনি আরো বলেছেন, বাংলাদেশের ওপর দিয়ে তাদের সড়ক ব্যবহার করে পার্বত্য অঞ্চলের উন্নয়ন করা সম্ভব। বর্তমানে শিলিগুড়ি করিডোর বা চিকেন নেক নামক করিডোর আসাম ও পশ্চিমবঙ্গের মধ্যে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। কিন্তু পথটি পাহাড়ি এবং তাতে রয়েছে বিপজ্জনক সব বাঁক। ফলে এই চিকেন নেক দিয়ে ভারী ট্রাক যাতায়াত বেশ বিপজ্জনক। তা ছাড়া ওই পথে যোগাযোগে ৪০০ কিলোমিটারের বেশি পথ পাড়ি দিতে হয়। সময় লাগে ১০ ঘণ্টারও বেশি। এখন সময় অনেক কম লাগবে। পরিবহন খরচ বাঁচবে। সহজে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে ভারতের নানা গন্তব্যে পৌঁছানো যাবে।

কলকাতা থেকে গুয়াহাটি হয়ে আগরতলার দূরত্ব ১৬৫০ কিলোমিটার। আর দিল্লি পর্যন্ত এই দূরত্ব ২৬৩৭ কিলোমিটার। কিন্তু কলকাতা থেকে বাংলাদেশের ওপর দিয়ে আগরতলা যেতে পারলে দূরত্ব কমে দাঁড়াবে মাত্র ৬২০ কিলোমিটার। ভারতীয় ওই মন্ত্রী বলেছেন, ত্রিপুরায় রান্না করার গ্যাসের চাহিদা দিনদিন বাড়ছে। আর সে কারণেই আগরতলা থেকে ২৫ কিলোমিটার দূরে বোধজুংনগর শিল্প এলাকায় একটি বোতলজাতকরণ প্রকল্প স্থাপিত হচ্ছে। এ থেকে স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, ভারত অব্যাহতভাবেই আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে পেট্রোলিয়ামজাত পণ্য সরবরাহের জন্য বাংলাদেশের সড়ক ব্যবহার করবে। ওই মন্ত্রী আরো প্রস্তাব করেছেন, বাংলাদেশের নৌপথ ব্যবহার করে কলকাতা থেকে পেট্রোলিয়াম পণ্য এনে ত্রিপুরার বোতলজাতকরণ প্রকল্প পূর্ণমাত্রায় উৎপাদনে যেতে পারে।
তবে বাংলাদেশের পর্যবেক্ষকেরা বিনামূল্যে এই পণ্য পরিবহনের পক্ষে ভারতীয় যুক্তি মেনে নিতে রাজি নন। ভারত বলেছে, প্রবল বৃষ্টিতে ওই রাস্তার ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে এবং তা সংস্কারে দীর্ঘ সময় লাগবে। কিন্তু ভারতের ওই সড়কের বিকল্প রেল যোগাযোগব্যবস্থা চালু রযেছে। সুতরাং তারা সহজেই বাংলাদেশের ওপর চাপ সৃষ্টি না করে তাদের রেলপথে ওই পণ্য পরিবহন করতে পারত। পর্যবেক্ষকদের মতে, প্রতি বছর বর্ষা মওসুমে বাংলাদেশে রাস্তাঘাট এমনিতেই ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কখনো কখনো তা চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। তার ওপর, যদি প্রতিদিন এত বিপুলসংখ্যক ভারতীয় ট্যাংক-লরি ওই পথে যাতায়াত করে, তাহলে এ সড়কগুলো আর চলাচলের উপযুক্ত থাকবে না। লক্ষণীয় ব্যাপার হচ্ছে, এ রকম একটি চুক্তির বিষয়ে সরকার জাতীয় সংসদেও কোনো আলোচনা করেনি। অত্যন্ত সঙ্গোপনে মিডিয়া এবং জনগণের দৃষ্টি এড়িয়ে এমন ধরনের জাতীয় স্বার্থবিরোধী চুক্তি সম্পন্ন করা হয়েছে।

আরো একটি ব্যাপার হলো, এ মুহূর্তে ভারত ও বাংলাদেশ দুই দেশের মধ্যকার ভিসা সুবিধা বাড়ানোর জন্য আলোচনা করছে। তাতে আন্তঃনগরী যাত্রী পরিবহন অন্তর্ভুক্ত থাকবে। সম্প্রতি ‘শিলং টাইম’ পত্রিকা রিপোর্ট করেছে, মেঘালয় দু’টি বিলাসবহুল এসি বাস কিনেছে। এ দু’টি বাস সরাসরি শিগগিরই শিলং থেকে ঢাকা যাতায়াত করবে। অবশ্য এখন ঢাকা থেকে শিলং হয়ে গুয়াহাটি রুটে বাস সার্ভিস চালু আছে। গত ৪ মে উভয় দেশের পরিবহন, স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা দুই দেশের মধ্যকার যাত্রীবাহী বাস সার্ভিসের অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্য শিলংয়ে একটি বৈঠক করেছেন। তাতে যে চারটি রুট দিয়ে উভয় দেশের মধ্যে যাত্রী পরিবহন চলছে, তাকে আরো ‘আরামদায়ক’ করার বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। বলা হচ্ছে, আঞ্চলিক যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের জন্য এই বাস সার্ভিসের আয়োজন। ভারত ও বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বাংলাদেশ, ভুটান, ভারত, নেপাল মোটরযান চলাচল চুক্তি স্বাক্ষর করেছে। নেপালও তা অনুমোদন করেছে। ভুটান সে অনুমোদন পিছিয়ে দিয়েছে। ফলে চার দেশের মধ্যেও সড়ক যোগাযোগব্যবস্থা চালুই হতে পারেনি। কার্যত সব সুবিধা ভোগ করছে একমাত্র ভারত। আর আমরা হারাতে বসেছি আমাদের সড়ক ও জনপথ এবং এক অর্থে সার্বভৌমত্ব।

লেখক : সাংবাদিক ও সাহিত্যিক
rezwansiddiqui@yahoo.com

Leave a Reply

Go Top
%d bloggers like this: