সরকারের জিয়া ‘পুনর্বাসন’ প্রকল্প

মাসুদ মজুমদার

শেষ পর্যন্ত জাদুঘর থেকে জিয়ার স্বাধীনতা পদকটি সরিয়ে নেয়া হলো। জাতীয় জাদুঘরে এ বিষয়ক কর্নারটিও আর থাকছে না। অন্তত এই সরকারের আমলে পদকটি আর জাদুঘরে ফিরে যাওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের জের। রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত নেয়ার সক্ষমতা অর্জন করতে পারলেই এই পদক বিএনপি হয়তো আবার জাদুঘরে পুনঃস্থাপন করতে পারবে, নয়তো নয়।
জিয়া আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এখন হজরত শাহজালাল রহ: আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর। সরকার ঠাণ্ডা মাথায় জিয়ার নাম বিমানবন্দর থেকে সরিয়েছে। সক্ষমতা সম্পর্কে দ্বিধাদ্বন্দ্ব ছিল বলেই সে সময় বঙ্গবন্ধুর নামে বিমানবন্দর করা হয়নি। হজরত শাহজালাল রহ: এ দেশের সুফি সাধকদের মধ্যে শীর্ষস্থানীয়। সুদূর ইয়েমেন থেকে তিনি বাংলাদেশে এসে কিছু অতিলৌকিক কারামত প্রদর্শন করেন। ধর্মপ্রচারক ছিলেন কি না সেই বিতর্ক না করেও বলা যায়, তার অতি পরিচ্ছন্ন ও অনাড়ম্বর জীবন, সাম্য নীতির অনুসরণ স্থানীয় মানুষের মধ্যে ব্যাপক প্রভাব ফেলে। অনেক ভিন্নধর্মী মানুষ যারা বর্ণবাদের কারণে অচ্ছ্যুত হিসেবে নিগৃহিত হচ্ছিল তার সান্নিধ্যে গিয়ে এবং তার অধ্যাত্ম্যবাদের প্রভাবে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হন এবং মানবিক মর্যাদা পান। হজরত শাহজালাল রহ: সম্পর্কে অনেক ঐতিহাসিক ঘটনা ও স্থানীয় রাজাকে পরাজিত করে প্রজাদের ওপর ধর্মীয় ও সামাজিক উৎপীড়ন বন্ধের উপমা কিংবদন্তি হয়ে আছে। সরকার এই সাধকের নাম জিয়ার স্থলে স্থাপন করে সব সম্ভাব্য প্রতিক্রিয়ার তাৎক্ষণিক অবসান ঘটিয়েছে। একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত ধর্মীয় আবেগ দিয়ে মোকাবেলার এ নজিরটি ধর্মনিরপেক্ষ ধারণার সাথে সাংঘর্ষিক বলেই কেউ কেউ অভিমত দিয়েছিলেন; কিন্তু হজরত শাহজালাল ইয়েমেনি রহ:-এর ব্যাপারে জনমনে ইতিবাচক ধারণা, শ্রদ্ধা উত্তুঙ্গ সম্মান ও সমীহবোধ রাজনীতির ঊর্ধ্বে স্থান পায়। সম্ভবত অলি আল্লাহর বাংলাদেশ ও শহীদ-গাজীর বাংলাদেশে ইতিহাসের চৈতন্যবোধ লঙ্ঘন ও ঐতিহ্যের নাড়ি কেটে দেয়া এ জন্য কারো পক্ষে সম্ভব নয়।
জিয়ার কবরটি চন্দ্রিমা উদ্যান থেকে সরানোর জন্য সরকার একাধিক প্রকল্প হাতে নেয়। প্রথমে হঠাৎ এক রাতে কবরপথের বেইলি ব্রিজ সরিয়ে ফেলা হয়। তারপর বিশেষ বিশেষ দিবসে জনসমাগম নিয়ন্ত্রণ করা হয়। শেষ পর্যন্ত জাতীয় সংসদের মূল নকশায় কবরের ঠাঁই না থাকার বিষয়টি সামনে আনা হয়। লুই কানের স্থাপত্য নকশার মূল দলিলটি খুঁজে পেতে একটি বিশেষ কমিটি বিদেশে সফরেও যায়। জিয়ার কবর সরানোর প্রকল্প থেকে সরকার সরে না আসার কথা জাতিকে বারবার স্মরণ করে দেয়া হচ্ছে। আরো কিছু স্থাপনা থেকে জিয়ার নাম মুছে ফেলা হয়। বরাদ্দ দেয়া সঠিক কি সঠিক নয় সেটা ভিন্ন প্রসঙ্গ। জিয়ার জন্য সেনানিবাসের ভেতর বরাদ্দ দেয়া মঈনুল সড়কের বাড়ি থেকে বেগম খালেদা জিয়াকে যেভাবে হটানো হয়েছে, চোখের পানি ঝরিয়ে বেগম জিয়ার বেদনাবিধুর ‘গৃহত্যাগ’ যে সুখকর ছিল না সেটা সবার জানা।
বঙ্গবন্ধুর নামে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর স্থাপনের জন্য আড়িয়াল বিলের উদ্যোগটি স্থানীয় জনগণের আপত্তির মুখে স্থগিত কিংবা বাতিল করা হয়। এক সময় পদ্মার ওপারে কিংবা বৃহত্তর ফরিদপুরে বঙ্গবন্ধুর নামে একটি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর করার কথা শোনা যায়। আমাদের লাগাতার স্বাধিকার ও মুক্তির আন্দোলনে জিয়ার উপস্থিতি আছে কি নেই, সেটা গবেষণার বিষয়। তবে মুক্তিযুদ্ধে জিয়া হঠাৎ জ্বলে ওঠা এক নাম। কার পক্ষে ঘোষণা দিয়েছেন সেটা প্রমাণিত; কিন্তু আক্ষরিক অর্থে জিয়া মুক্তিযুদ্ধের ঘোষক। লাগাতার শোষণমুক্তি কিংবা স্বাধিকার আন্দোলনে জিয়া মিছিল-মিটিংয়ে থাকার কথা নয়। সময় যখন এলো তখন জিয়াই সময়ের বরপুত্র হয়ে ইতিহাসে নাম লেখালেন। এটা অস্বীকার করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ইতিহাস এই সুযোগ কাউকে দেবে না। তাই বলে কখনো বঙ্গবন্ধু সমান্তরাল জিয়া কেন, কাউকে বসাতে রাজি নই। জিয়ার জন্য নির্ধারিত স্থান ইতিহাসই ঠিক করে দিয়েছে। সেখানেই জিয়া থাকবেন। বঙ্গবন্ধুর স্থান ইতিহাস যেখানে রেখেছে সেখান থেকে টলাতে পারে- এমন কোনো শক্তির অস্তিত্ব এই দেশে, এই মানচিত্রে কল্পনাও করা ঠিক নয়। দেশ ধারণা পাল্টালে আলাদা কথা।
প্রশ্ন হচ্ছে, আওয়ামী লীগ এ ধরনের আনকোরা একটি উদ্ভট মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধে নামল কেন, এটা জিয়াবিদ্বেষ, না জিয়ার রাজনীতির প্রতি এক ধরনের অ্যালার্জি। বিদ্বেষ কিংবা অ্যালার্জি যেটাই হোক, এটা নতুন প্রজন্মের ভেতর জিয়ার ব্যাপারে উৎসাহ বাড়াচ্ছে। এক ধরনের অনুসন্ধিৎসা থেকে জিয়া পাঠ বেড়ে যাচ্ছে। নিষিদ্ধের প্রতি বাড়তি আসক্তির ফায়দা তুলবে জিয়ার রাজনীতির অনুসারীরা। ইতিহাস পাঠের এ দিকটায় আওয়ামী লীগের চিন্তকেরা মনোযোগী হলেন না কেন তা এখনো বোধগম্য নয়। ইতিহাস পাল্টে দেয়া কঠিন, নাম মুছে ভাস্কর্য উপড়ে ফেলে এটা সম্ভব নয়। পাঠ্যপুস্তক থেকে নাম মুছে দিলেও ইতিহাস ইতিহাসের প্রয়োজনে সেটা আবার টেনে তোলে।
ইতিহাসের সাক্ষী স্বয়ং সৃষ্টিকর্তাও রেখে দিয়েছেন। ওল্ড ও নিউ টেস্টামেন্ট জুড়ে বেশ কিছু ইতিহাস চর্চার বিষয় রয়েছে। পবিত্র কুরআন মানবজাতিকে নতুন করে ইতিহাসই শুধু শেখায়নি; ইতিহাস বর্ণনা করে বর্তমানকে বোঝাতে চেয়েছে। ভবিষ্যতের পরিণতি সম্পর্কেও অনেক আভাস দিয়েছে। হজরত মুসা নবীর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে যে ফেরাউন স্পর্ধা প্রদর্শন করেছিল, তার লাশ ‘নজির’ করে রাখা হয়েছে। বিভিন্ন জাতির ওপর আপতিত খোদায়ি আজাবগুলোর নজিরও মুছে ফেলা হয়নি।
নিষ্ঠার সাথে মার্কসবাদ লেনিন যেমন অনুসরণ করতে পারেননি। মাও সে তুংও পারেননি। ক্রেন দিয়ে লেনিনের মূর্তিটি সরানো হলো সোভিয়েত পতনের পর, তাতে কি তিনি মুছে গেছেন। চার কুচক্রী নিয়ে অনেক কথা; কিন্তু মাও কি ইতিহাসে নেই। হালাকু, চেঙ্গিস, হিটলার কেউ ইতিহাস থেকে মুছে যায়নি। যাবে না। মহানায়কেরা যেমন ইতিহাসে থাকেন, তেমনি খলনায়কেরাও থাকে। ইতিহাস নিয়ে তাই আবেগ চলে না।
ইতিহাসের জিয়া বা লাগাতার স্বাধিকার ও মুক্তি আন্দোলনে জিয়ার অবদান নিয়ে বিতর্ক চলে। তার রাজনীতি নিয়ে শুধু বিতর্ক নয়, আলোচনা-সমালোচনাও হতে পারে; কিন্তু মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা বিতর্কিত করে তুলে ধরলে আমরা ছোট হয়ে যাবো।
তাই শাসকদের ইচ্ছামতো ইতিহাস লিখেও সত্য এড়ানো যায় না। মিথ্যা টেকানো যায় না। মানুষ যত বড় মহামানব হোক, তার একটা নন্দিত দিক যেমন থাকে, তেমনি নিন্দিত না হোক বিতর্কিত কিছু বিষয়ও থাকে। নবী-রাসূল ছাড়া আর কাউকে শতভাগ পারফেক্ট করে উপস্থাপন করার সুযোগ নেই। আমাদের জানা মতে, নবী-রাসূলদের যেসব পরীক্ষা নেয়া হয়েছে, সেসব আসমানি কিতাবে গোপন করা হয়নি। শিক্ষণীয় করে উপস্থাপন করা হয়েছে। সেটা করা হয়েছে উপভোগ বা শুধু চর্চার জন্য নয়- শিক্ষার জন্য। শিক্ষণীয় দিকটি অনুসরণ করে সৃষ্টিকর্তার প্রতি বিশ্বাসের দৃঢ়তা বাড়ানোর জন্য।
আমাদের কোনো জাতীয় নেতাই সব বিতর্কের ঊর্ধ্বে নেই। তাদের তিন কালের রাজনীতির ভেতর ফারাকগুলো স্পষ্ট। একাডেমিক আলোচনার বাইরে তাদের সীমাবদ্ধতাগুলো আমরা চর্চার বিষয় বানাতে চাই না। শেরেবাংলা, সোহরাওয়ার্দী, মওলানা ভাসানীর রাজনীতি আমাদের কাছে খোলামেলা। তাদের বৈপরীত্যগুলো জাতির জন্য কোনো প্রয়োজনীয় উপমা নয়। তাদের সুকৃতি এবং জাতির জন্য ত্যাগ ও কোরবানির দৃষ্টান্তগুলোর সাথে স্বচ্ছতার যে সংশ্রব সেই রাজনীতির পথে চলাই আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা। জোর করে কাউকে বড় করার জন্য অন্যকে ছোট করা, কাউকে ইতিহাসে তোলার জন্য বড় কোনো নেতার সমান্তরালে তুলে আনা অর্থহীন। কারণ, ইতিহাস নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের কারণে যার যা প্রাপ্য তাই পাইয়ে দেয়। যে স্থানে রাখা সঠিক মনে করে সেখানেই রাখে, সেটা রাজনৈতিক জেদ কিংবা দলীয় প্রতিহিংসার কারণে উপড়ে ফেলা সম্ভব নয়।
শুরুতে যেমনটি বলেছিলাম, জিয়া পুনর্বাসন প্রকল্প মনে হয় এই সরকারের ভাবমর্যাদার সাথে গেলেও জাতির মন-মননের সাথে যাচ্ছে না। এর মাধ্যমে জিয়ার প্রতি শুধু আগ্রহ বাড়াচ্ছে না, তার প্রতি সহমর্মিতা বাড়াচ্ছে। ইতিহাসের অণ্বেষণাকে অনিবার্য করে দিচ্ছে। সেখানে রাজনীতির জঞ্জাল সরালে জিয়া আসবেনই। বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর বঙ্গবন্ধু ও জিয়া সম্পর্কে একটি ভারসাম্যপূর্ণ বক্তব্য সাধারণ মানুষকে বেশ টানে। তাই আওয়ামী লীগ জিয়া পুনর্বাসন প্রকল্পটি বাতিল করলেই লাভবান হবে।
জিয়া বিতর্ক একটি পক্ষকে বঙ্গবন্ধু বিতর্কে উৎসাহিত করবে। সেটা হবে অকল্যাণকর। জিয়া পাকিস্তানি চর মুক্তিযুদ্ধে অনুপ্রবেশকারী- এ ধরনের অশোভন ও অসত্য বক্তব্য আওয়ামী লীগ নেতারা বলেন বলেই রাজনৈতিক কারণে বঙ্গবন্ধুর বিরুদ্ধেও কিছু উসকানিমূলক বক্তব্য বিএনপি নেতারা দিয়ে থাকেন। বাস্তবে বঙ্গবন্ধুকে ছোট করা হলে জিয়া বড় হওয়ার সুযোগ নেই। জিয়াকে ফুৎকারে উড়িয়ে দিলে বঙ্গবন্ধুকেই অসম্মান করা হবে।
masud2151@gmail.com

Leave a Reply

Go Top
%d bloggers like this: