Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /customers/4/a/c/dailybdtimes.com/httpd.www/wp-includes/post-template.php on line 284

লন্ডনের রাস্তায় শরণার্থীদের পক্ষে হাজারো মানুষের বিক্ষোভ

শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় বৃটিশ সরকারকে আরো বেশি পদক্ষেপ নেয়ার দাবিতে লন্ডনে রাজনীতিবিদ, সেলিব্রেটিসহ হাজার হাজার মানুষ বিক্ষোভ করেছে। শরণার্থীদের প্রসঙ্গ তুলে দাবি করা হয়েছে কেউই অবৈধ নয়। মানুষ ডুবে মারা যাওয়া বন্ধ করতে হবে। সবাইকে মানবিক হতে হবে। লন্ডনের পার্ক লেনে বিক্ষোভকারীদের হাতে বহন করা প্ল্যাকার্ডে ছিল এ রকম নানা স্লোগান। বর্তমান ও পূর্ববর্তী সরকার মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে। সোমবার যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার আমন্ত্রণে নিউ ইয়র্কে বসছে শরণার্থী ও অভিবাসনবিষয়ক জাতিসংঘের সম্মেলন। এতে যোগ দেয়ার কথা বৃটিশ প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে’র। ঠিক তার আগে সলিডারিটি উইথ রিফিউজিস, অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল, অক্সফাম, মেডিসিনস সানস ফ্রন্টিয়েরস, দ্য রিফিউজি কাউন্সিল ও স্টপ দ্য ওয়ার কোয়ালিশনের যৌথ আয়োজনে ‘রিফিউজিস ওয়েলকাম’ শীর্ষক ওই বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়েছে। এ সময় বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের হাতে যেসব প্ল্যাকার্ড ছিল তার একটিতে লেখা ছিল- তেরেসা মে, আপনাকে বলতে হবে, শরণার্থীদের স্বাগতম। এ খবর দিয়েছে দ্য গার্ডিয়ান। বিক্ষোভে অংশ নেন অভিনেতা ভ্যানেসা রেডগ্রেভ, ডগলাস বুথ, জুলিয়েট স্টিভেনসন। যোগ দেন গ্রিন পার্টির নেতা ক্যারোলিন লুকাস এমপি, লেবার দলের লর্ড আলফ দুবস, লিবারেল ডেমোক্রেট দলের প্রচারক শাস শিহান। বিক্ষোভে অংশ নিয়ে তারাও বক্তব্য দেন। বক্তব্যে ভ্যানেসা রেডগ্রেভ বলেন, কে কোথা থেকে এসেছে সেটা যা-ই হোক, এ দেশের নাগরিকরা সবাই আইন মেনে চলতে চান। মানবাধিকারের আইন আছে। বর্তমান সরকার ও পূর্ববর্তী সরকার, হোক সেটা লেবার বা কনজারভেটিভ- দু’পক্ষই মানবাধিকারের আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করেছে। অবশ্যই তাদের জবাবদিহির আওতায় আনা উচিত। লর্ড দুবস বলেছেন, শরণার্থী সংকট মোকাবিলায় সরকার অসহায় হয়ে পড়েছে। তিনি পার্লামেন্টের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, আমি আপনাদের বলছি, ওখানকার চেয়ে এখানে দাঁড়িয়ে কথা বলা লক্ষ গুণ উত্তম। একটিই জিনিস আছে যা এই সরকারের মোড় ঘুরিয়ে দিচ্ছে। সেটা হলো জনগণের মতামত। এর নেপথ্যে রয়েছেন আপনারা। তার সঙ্গে একমত পোষণ করেন সলিডারিটি উইথ রিফিউজিসের পরিচালক রোস ইরিয়েরা। তিনি মনে করেন শরণার্থী ইস্যুতে পদক্ষেপ নেয়ার বিষয়ে নেতৃত্বের সংকট রয়েছে। তাই বৈশ্বিক ওই সম্মেলনে আমাদের প্রধানমন্ত্রী তেরেসা মে প্রথম সুযোগ পাচ্ছেন আমাদের বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার। আমি আশা করছি ব্রেক্সিট-পরবর্তীকালে আমরা কী রকম দেশ হবো তার নতুন নেতৃত্বের অধীনে তিনি তা জানান দেবেন। আশা করছি, তিনি আমাদের মুক্তমনা, সহনশীল হিসেবে তুলে ধরবেন। তিনি জানান দেবেন, বৃটিশসমাজ অতিথিপ্রবণ। এ সমাজ বৈশ্বিক মঞ্চে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে চায়। একই সঙ্গে বৈশ্বিক মানবিক সমস্যা সমাধানে যথোপযুক্ত নেতৃত্ব দিতে চায়। গ্রিন পার্টির নেতা লুকাস বলেছেন, শরণার্থী সমস্যা সমাধান শুধু মানবিক নয়, এটি রাজনৈতিক ইচ্ছারও বিষয়। কী পরিমাণ মানুষ আসছে সংকট সেখানে নয়। সংকট হলো তাদের বিষয়ে সরকার কী ব্যবস্থাপনা রক্ষা করছে সেখানে। জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার মতে, এ বছর ভূ-মধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে যাওয়ার পথে কমপক্ষে ৩২০০ মানুষ হয়তো মারা গেছেন না হয় তারা নিখোঁজ। মোট ৩ লাখ মানুষ এভাবে ঝুঁকিপূর্ণ সফরে অংশ নিয়েছে। কয়েক হাজার মানুষ গ্রিস ও ইতালিতে আটকা পড়ে নাজুক অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। গত বছরও ‘রিফিউজিস ওয়েলকাম’ এ রকম বিক্ষোভের আয়োজন করেছিল। তাতে যোগ দিয়েছিল এক লাখ বিক্ষোভকারী। তুরস্কের সমুদ্র সৈকতে পড়ে থাকা ছোট্ট শিশু আয়লান কুর্দির মৃতদেহের ছবি প্রকাশের পর এমন বিক্ষোভের আয়োজন করা হয়েছিল। ওই র‌্যালির পর সরকার ২০২০ সালের মধ্যে সিরিয়ার ২০ হাজার শরণার্থীকে পুনর্বাসনে সম্মত হয়। কিন্তু সলিডারিটি উইথ রিফিউজির পরিচালক রোস ইরিইরা বলেছেন, তারপর থেকে ওই কর্মকাণ্ড ধীরগতিতে এগুচ্ছে। আমি সব সময়ই আশা করি এ বিষয়টি আরও ভালোভাবে এগুবে। তবে এটা সঠিক পথের দিকে বড় ধরনের একটি পদক্ষেপ। আমরা এই মুহূর্তেই আমাদের প্রতিশ্রুতি পূরণের জন্য সঠিক পথে নেই এবং অবশ্যই আমাদের আরও বেশি কিছু করার রয়েছে। অবস্থার আরও অবনতি ঘটছে। এখনও মানুষ মরছে এবং আমাদের এটা ঠেকাতে হবে। বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে শরণার্থীরাও ছিলেন। তাদের একজন কায়েস আলদাহোউল। সিরিয়ার রাজধানী দামেস্কের কায়েস ২০০৯ সালে যুক্তরাজ্যে আসেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ালেখা করার জন্য এবং সিরিয়ার যুদ্ধাবস্থা শুরুর পর থেকে তিনি এখানেই রয়ে গেছেন। ২৪ বছর বয়সী কায়েস বলেন, দিন দিন শরণার্থী পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাচ্ছে। শরণার্থীদের জন্য সমর্থন জোগাতেই তিনি এই বিক্ষোভে যোগ দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘এটা কেবল সমর্থন নয়; এটার অর্থ এই নয় যে আরও বেশি বেশি শরণার্থীকে নিয়ে আসতে হবে। বরং এটা হলো সার্বিক পরিস্থিতিতে শরণার্থী শিবির ও গোটা ইউরোপকেই সহায়তা করার জন্য। শরণার্থীরা অত্যন্ত নাজুক অবস্থায় রয়েছে।’ তার নিজ দেশ সিরিয়াতে সামরিক বাহিনীতে যোগ দেয়া বাধ্যতামূলক বলে দেশে ফিরলে তাকেও যুদ্ধ করতে হতো বলে জানান তিনি। যুক্তরাজ্যে তিনি কেন রয়েছেন, এর জবাবে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ালেখা শেষ হওয়ার ঠিক আগে আগেই সিরিয়াতে যুদ্ধ শুরু হয়ে গেল। আমার সামনে কোনো সুযোগ ছিল না। আমার কোথায় যাওয়ার ছিল?’ আরেক শরণার্থী ৪৪ বছর বয়সী মিরেলা রেলিজান-ডিলানি। ক্রোয়েশিয়ার যুদ্ধাবস্থা এড়াতে নব্বইয়ের দশকে তিনি চলে আসেন যুক্তরাজ্যে। তিনি বলেন, ‘কোনো কাজ করতে পারছিলাম না, বাইরে বের হতে পারছিলাম না। আমি কোনো পক্ষে যেতে পারিনি, কাউকে ঘৃণা করতে পারিনি এবং কাউকে হত্যাও করতে পারিনি। পরিস্থিতি খুবই খারাপ ছিল।’ পরে আর দেশে ফিরতে পারেননি মিরেলা। যুক্তরাজ্যেই থেকে যান তিনি এবং উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করে সুন্দর একটি জীবনযাপনের স্বপ্ন নিয়ে সময় পার করেন তিনি। মিরেলা বলেন, ‘এই বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যে যেখানে কাজ করে নিজের পরিবার নিয়ে সুন্দর একটি জীবনযাপন করতে পারেন, সেখানেই তার বেঁচে থাকার অধিকার থাকা উচিত।’
লন্ডন পার্ক লেনের বিভিন্ন বয়সী বিক্ষোভকারীরা অংশ নিয়েছেন। তাদের মধ্যে যেমন ছিলেন শিশুরা, তেমন ছিলেন বয়স্করাও। সবাই মিলে স্লোগান দিয়েছেন শরণার্থীদের পক্ষে। ৭৩ বছর বয়সী হোসে পেটো বলেন, ‘শরণার্থীরাও অন্য সবার মতোই। আমরা তাদের দেশ ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তানে বোমা হামলা করছি এবং তাদের গ্রহণ করতে অস্বীকার করছি। এটা অপরাধ।’ পায়ের সমস্যার কারণে স্ক্র্যাচে ভর করে হাঁটতে হয় ড্যানিয়েল হ্যারিসকে। তা সত্ত্বেও ৩৫ বছর বয়সী এই ব্যক্তি সহমর্মিতা জানাতে অংশ নিয়েছেন এই বিক্ষোভে। আর শরণার্থীদের জন্য ‘সরকার যথেষ্ট কাজ করছে না’ বলে অভিমত তার। তিনি বলেন, ‘আরও বেশি শিক্ষা পেলে মানুষ বুঝতে পারবে যে এটি একটি মানবিক ইস্যু, অর্থনৈতিক নয়। শরণার্থীদের নিয়ে যথেষ্ট পরিমাণে কাজ হচ্ছে না। এটা খুবই বাজে ব্যাপার।’ আয়োজক সংগঠনগুলো জানিয়েছে, এই বিক্ষোভ র‌্যালিতে প্রায় ১০ হাজার মানুষ অংশ নিয়েছেন।

Leave a Reply

Go Top
%d bloggers like this: