সংলাপে অভিমত: ভারতের ট্রানজিট ফি দেশের স্বার্থের অনুকূল নয়

ভারতের জন্য নির্ধারিত ট্রানজিট ফি বা মাশুলের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, ট্রানজিট মাশুল এমনভাবে নির্ধারিত হওয়া উচিত যাতে এ জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত খরচ উঠে আসে। বর্তমান অবকাঠামো আমাদের নিজেদের চাহিদা মেটাতেই সক্ষম নয়। কোর কমিটির সুপারিশকে পাশ কাটিয়ে ভারতের জন্য ট্রানজিট মাশুল নির্ধারণ করা হয়েছে টনপ্রতি মাত্র ১৯২ টাকা। মাশুল নির্ধারণের এ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে। এই পদক্ষেপ বাংলাদেশের স্বার্থের অনুকূল নয়।
তিনি বলেন, ট্রানজিটের জন্য একটি সমন্বিত চুক্তি হওয়া প্রয়োজন, মাশুলও হতে হবে সমন্বিত। বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে পণ্য পরিবহন করে ভারতের যে অর্থ ও সময় সাশ্রয় হবে তার লাভের ভাগ আমরা পাব না কেন?
রামপাল কায়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন প্রক্রিয়া পর্যবেক্ষণের জন্য একটি জাতীয় কমিটি গঠনেরও সুপারিশ করেন মোস্তাফিজুর রহমান।
গতকাল বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্কের ওপর রাজধানীর ডেইলি স্টার সেন্টারে আয়োজিত সংলাপে সিপিডির নির্বাহী পরিচালক এসব কথা বলেন। ইংরেজি  দৈনিক ডেইলি স্টার ও দ্য ইনস্টিটিউট ফর পলিসি, অ্যাডভোকেসি অ্যান্ড গভর্ন্যান্স (আইপিএজি) দিনব্যাপী এ সংলাপের আয়োজন করে।
ভারতের সাথে ট্রানজিট-ট্রান্সপোর্টেশনে ভালো অগ্রগতি হয়েছে উল্লেখ করে সংলাপে প্রধানমন্ত্রীর অর্থনৈতিক উপদেষ্টা ড. মশিউর রহমান বলেন, ভারতের সাথে ট্রানজিট ফি নির্ধারণ করে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড যে সার্কুলার জারি করেছিল তা বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার নীতিবিরুদ্ধ। তিনি বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে যে রূপরেখা চুক্তিগুলো হয়েছে তাতে নেপাল ও ভুটানও উপকৃত হবে। তবে সংবিধান প্রণয়ন নিয়ে নেপালে রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে অধিকাংশ সময়েই অন্তর্বর্তী সরকার ক্ষমতায় থাকে। আর অন্তর্বর্তী সরকার কোনো দেশের সাথে চুক্তি করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে না।
অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেন, বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সম্পর্ক অন্য যেকোনো সময়ের তুলনায় ভালো অবস্থানে রয়েছে, যা অত্যন্ত স্বাস্থ্যকর। কিছুদিনের মধ্যেই বাংলাদেশ-ভুটান-ভারত-নেপাল (বিবিআইএন) উপ-আঞ্চলিক সহযোগিতার দৃশ্যমান অগ্রগতি হবে।
পায়রা বন্দর স্থাপনে ভারত ও চীনÑ উভয়ের সহযোগিতা চাওয়া হবে উল্লেখ করে অর্থমন্ত্রী বলেন, এ ব্যাপারে দুই দেশের সাথেই আলোচনা করা হবে। আগামী তিন থেকে ছয় মাসের মধ্যে এসব আলোচনা অনুষ্ঠিত হবে।
মুহিত বলেন, বাংলাদেশে ভারতের অনেক টিভি চ্যানেল দেখা গেলেও পশ্চিমবঙ্গে বাংলাদেশের চ্যানেল দেখা যায় না। এ জন্য তাদের বেসরকারি খাত চ্যানেলপ্রতি দুই কোটি রুপি দাবি করে। এটা খুবই হতাশাজনক।
দারিদ্র্য বিমোচনে সরকারের সফলতা তুলে ধরে অর্থমন্ত্রী বলেন, ২০২৪ সালের মধ্যে বাংলাদেশ থেকে দারিদ্র্য বিদায় নেবে।
সিপিডির চেয়ারম্যান অধ্যাপক রেহমান সোবহান বলেন, চীনের সাথে বাংলাদেশের বাণিজ্য ঘাটতি ভারতের তুলনায় অনেক বেশি। কিন্তু এটা নিয়ে খুব একটা উচ্চবাচ্য হয় না। তিনি বলেন, বাংলাদেশের ভেতর দিয়ে কলকাতা থেকে ত্রিপুরায় ভারতের যেসব পণ্য পরিবহন হয়, তাতে বাংলাদেশী মালিকানাধীন পরিবহনই ব্যবহার করা হয়। এতে বাংলাদেশ উপকৃত হচ্ছে।
অনুষ্ঠানের উন্মুক্ত আলোচনায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, ভারতের জন্য নির্ধারিত ট্রানজিট ফি খুব কম হলে বাংলাদেশের ব্যবসায়ীরা উত্তর-পূর্বাঞ্চলে বাণিজ্যের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়বেন।
ভারতের ডেপুটি হাইকমিশনার বলেন, পরস্পরের স্বার্থ সংরক্ষণ করে উভয়ের জন্য লাভজনক সম্পর্কই ভারত ও বাংলাদেশের দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতার ভিত্তি। আমরা বিশ্বাস করি অর্থনৈতিক অগ্রগতি ও উন্নয়নের জন্য আঞ্চলিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা প্রয়োজন এবং এটা একটা সমন্বিত দায়িত্ব। সমুদ্র ও স্থলসীমার নিষ্পত্তি আমাদের কার্যকরভাবে সীমান্ত ব্যবস্থাপনায় সহায়তা করবে। পারস্পরিক স্বার্থেই দুই দেশকে বিদ্যমান সহযোগিতামূলক সম্পর্ককে টেকসই ও সম্প্রসারিত করতে হবে।
অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য দেন ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম। ইন্দো-বাংলা সম্পর্কের ওপর আলোকপাত করেন আইপিএজি চেয়ারম্যান অধ্যাপক মুনির খসরু। আরো বক্তব্য রাখেন বাংলাদেশে ভারতের সাবেক হাইকমিশনার রজিত মিত্র, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ, ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আইনুন নিশাত, বুয়েটের অধ্যাপক ম তামিম, এসিআই লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. আরিফ দৌল্লা, কনফেডারেশন অব ইন্ডিয়ান ইন্ডাস্ট্রির সদস্য পঙ্কজ তেন্ডন, ভারতের এনার্জি অ্যান্ড রিসোর্সেস ইনস্টিটিউটের ফেলো নিত্য নন্দা, নিরাপত্তা বিশ্লেষক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব:) শাহেদুল এনাম, ভারতের দ্য হিন্দু পত্রিকার কূটনৈতিক সম্পাদক সুহাশিনী হায়দার ও ভারতের ওভারসিস রিসার্চ ফাউন্ডেশনের ফেলো অশোক মালিক।

Leave a Reply

Go Top
%d bloggers like this: