Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /customers/4/a/c/dailybdtimes.com/httpd.www/wp-includes/post-template.php on line 284

জহির রায়হান হত্যাকাণ্ডের দায় এড়াতে পারেননা শেখ মুজিব

বিশেষ রিপোর্ট : : সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে শেখ মুজিব ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারী চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান সুপরিকল্পিত হত্যাকান্ডের শিকার হন। বাংলাদেশ তখন স্বাধীন সার্বভৌম। মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭২ সালের ১০ জানুয়ারী পাকিস্তানী পাসপোর্ট নিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন শেখ মুজিব। প্রথমেই রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন। এর দুইদিন পর ১২ জানুয়ারী পুনরায় প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। মুক্তিযুদ্ধ শেষে কোথায় কে কিভাবে রয়েছেন এসবের চেয়ে কাকে কিভাবে সাইজ করা যায় সেটা নিয়েই বেশি শেখ মুজিবকে বেশি ব্যস্ত দেখা যায়। প্রথমেই প্রধানমন্ত্রী পদ থেকে সরিয়ে দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম প্রধান সংগঠক এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিনকে সাইজ করা হয়।
এদিকে মুক্তিযুদ্ধের সময় নিখোঁজ হন শহীদুল্লাহ কায়সার। শহীদুল্লাহ কায়সার ছিলেন চলচ্চিত্রকার জহির রায়হানের ভাই। মুক্তিযুদ্ধের পর শহীদুল্লাহ কায়সারকে খোজাখুজি করতে থাকেন তার ভাই জহির রায়হান। শহিদুল্লাহ কায়সার এর স্ত্রী পান্না কায়সার। তাদের বাসার ফোন তখনো সচল। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারী রোববার সকালে রফিক নামের এক ব্যক্তির টেলিফোন আসে জহির রায়হানের কায়েতটুলির বাসায়। রফিক ছিলেন জহিরের পূর্ব পরিচিত যিনি ইউসিসে চাকরি করতেন । তিনি ফোনের অপরপ্রান্ত থেকে জানান শহীদুল্লাহ কায়সার মিরপুরে বিদ্রোহী পাকিস্তানীদের দখলীয় এলাকায় রয়েছে। খবর দিয়ে জানান বলেন দেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানী বাহিনীকে মুরগি সাপ্লাইকারী ছিলেন শাহরিয়ার কবির। শাহরিয়ার কবির সম্পর্কে জহির রায়হানের চাচাতো ভাই। ফোন পেয়ে ভাইকে খুজতে চাচাতো ভাই শাহরিয়ার কবিরকে সাথে নিয়ে মিরপুরে যান জহির রায়হান। বাংলাদেশ স্বাধীন হলেও মিরপুরে তখনো যুদ্ধাবস্থা। মিরপুরে তখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনী এবং পুলিশ সদস্যরা পাকিস্তানিদের প্রতি অনুগত বাহিনীকে পরাস্ত করার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। শাহরিয়ার কবির মিরপুরে গিয়ে সেখানে জহির রায়হানকে রেখে চলে আসেন। জহির রায়হান মিরপুরের অবরুদ্ধ এলাকার মধ্যে একই ঢুকে পড়েন। সম্ভাব্য বিপদ জেনেও জহির রায়হানকে সেখানে এক রেখে শতকে পড়েন রাজাকার শাহরিয়ার কবির।

১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারী স্বাধীন বাংলাদেশে ঢাকার মিরপুরে পাকিস্তানীদের প্রতি অনুগত সশস্র সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে একটি যুদ্ধাভিযান হয়েছিলো। ওই যুদ্ধাভিজানে সেনাবাহিনীর ৪২ জন এবং পুলিশের কমপক্ষে ৮০ জন নিহত হয়েছিলো। মিরপুরের ওই অভিযানেই নিহত হন চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান। ওইদিনের ঘটনার বর্ণনায় যুদ্ধাভিযানে অংশগ্রহনকারী অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল হেলাল মোরশেদ এবং আইনশৃংখলা বাহীনির আরো দুই সদস্য আমির হোসের এবং মোখলেস বোলেছেন কিভাবে জহির রায়হান নিহত হয়েছেন।

তাদের বর্ণনায় স্পষ্ট, ৭২ সালের ৩০ জানুয়ারী মিরপুরের অভিযানে নিহত হয়েছিলেন চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান। তাহলে এতদিন শাহরিয়ার কবির চক্র কেন বলে আসছিলেন জহির রায়হান অন্তর্ধান কিংবা নিখোজ? আরো কঠিন বাস্তবতা হলো, জহির রায়হানের লাশটি পর্যন্ত উদ্ধারের চেষ্টা করেনি শেখ মুজিব। শেখ মুজিব স্বাধীন বাংলাদেশে আসার পর জহির রায়হানের মতো মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের একজন বুদ্ধিজীবী হত্যা হলো অথচ শেখ মুজিব ছিলেন নির্বিকার। প্রশ্ন হলো, স্বাধীন বাংলাদেশে মিরপুরে সেনা বাহীনি এবং পুলিশের এতজন সদস্য নিহত হলো এই ব্যর্থতা কার? জহির রায়হানের লাশটি পর্যন্ত উদ্ধারের চেষ্টা করা হয়নি। কেন? এই ব্যর্থতা কার ? আসলে শেখ মুজিব কি করেছিলেন ? কি করতে চেয়েছিলেন?। ১৯৭১ সালের ৭ই মার্চ কিংবা ২৫ শে মার্চে শেখ মুজিবের ভূমিকে সম্পর্কে জনগনকে উল্টোপাল্টা বোঝানোর চেষ্টা চললেও ৩০ শে জানুয়ারীর ঘটনার ব্যাখ্যা কি ? এর জন্য কি কোন তদন্ত হয়েছিলো ? জহির রায়হান হত্যাকান্ডের কোন তদন্ত হয়েছিলো? কেন হয়নি? অনেকেই মনে করেন, জহির রায়হান হত্যাকান্ডের তদন্ত হলে সবক্ষেত্রেই একজন ক্ষমতালোভী শেখ মুজিবের ব্যর্থতা যেমন প্রকট হয়ে উঠবে তেমনি মুক্তিযুদ্ধের সময় কোলকাতায় আওয়ামী লীগের অনেক নেতার অপকর্ম প্রকাশ হয়ে পড়বে।

বাস্তবতা হলো, মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর জহির রায়হান আগরতলা হয়ে কলকাতায় পৌঁছান। পাকিস্তানের গণহত্যা বিশ্ববাসীর কাছে তুলে ধরার জন্য ‘’স্টপ জেনোসাইড” নামের একটি প্রামাণ্যচিত্র তৈরির উদ্যোগ নেন। সেই সময় কোলকাতায় শরণার্থী শিবিরে স্বাধীনতাকামী বাংলাদেশীদের দুর্দশার চিত্র এবং আওয়ামী লীগের অনেক নেতার আরাম আয়েশ এবং অপকর্মের চিত্র ধারণ করেন।
‘স্টপ জেনোসাইড’ ছবি নির্মানের পর ছবিটি মুক্তি দেয়ার প্রতিবাদে ১৯৭১ সালে ১০ই সেপ্টেম্বর কলকাতায় বসবাসরত ‘সন অব পাকিস্তান ’ চলচ্চিত্রের পরিচালক ও চ্যানেল আইয়ের ফরিদুর রেজা সাগরের ফজলুল হক তৎকালীন অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলামের কাছে একটি চিঠি লিখে প্রামাণ্য চিত্রটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার অনুরোধ জানিয়েছিলেন। এই চিঠিটি “বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের ইতিহাস ও দলিলপত্র তৃতীয় খন্ডের ১২৭-১২৮ পৃষ্ঠায় মুদ্রিত রয়েছে।
১৯৭২ সালের ২৫ জানুয়ারি প্রেসক্লাবে এক সাংবাদিক সম্মেলন করেন জহির রায়হান। সেখানে তিনি বলেন, ১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ডের পেছনে নীলনকশা উদ্ঘাটনসহ মুক্তিযুদ্ধের সময়ের অনেক গোপন ঘটনার নথিপত্র, প্রামাণ্য দলিল তার কাছে আছে, যা প্রকাশ করলে সদ্যস্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রীসভায় ঠাঁই নেয়া অনেক নেতার কুকীর্তি ফাঁস হয়ে পড়বে। তিনি ৩০ জানুয়ারি সন্ধ্যায় প্রেসক্লাবে একটি ফিল্ম শো প্রদর্শনীর মাধ্যমে প্রমাণ করবেন মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগ নেতাদের কার কি ভুমিকা ছিল?

জহির রায়হান হত্যাকান্ডের মাস দেড়েক পর শহিদুল্লাহ কায়সার ও জহির রায়হানের বোন নাফিসা কবির, শহিদুল্লাহ কায়সারের স্ত্রী পান্না কায়সার, জহির রায়হানের দ্বীতিয় স্ত্রী সুচন্দাসহ ১৯৭১ সালে নিহত বুদ্ধিজীবীদের পরিবারের অনেকে শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করতে গেলে শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে নাফিসা কবিরের উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। শেখ মুুজিব বলেন, “অনেকে তো দালালী করে মরেছে। জবাবে নাফিসা কবির বলেন, বুদ্ধিজীবীরা কেউ দালালী করে মরেনি। দালালী যারা করেছে তারা এখনও বেঁচে আছে। সে দালালদের বিচারের দাবী জানাতে এসেছি। এই তথ্যটি রয়েছে পান্না কায়সারের লেখা “ মুক্তিযুদ্ধ : আগে ও পরে“ বইতে।

১৯৯৩ সালের ৮ ডিসেম্বর অধুনালুপ্ত দৈনিক আজকের কাগজ পত্রিকায় প্রকাশিত জহির রায়হান এর প্রথম স্ত্রী প্রয়াত অভিনেত্রী সুমিতা দেবী এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন ”জহির রায়হানকে টেলিফোন করেছিল যে রফিক, তাকে নিয়ে যখন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি শুরু হলো। তখন তার পুরো পরিবারসহ আমেরিকায় পাঠিয়ে দেয়া হলো“। “রাহুর কবলে বাংলাদেশের সংস্কৃতি’ গ্রন্থের ১০৮ নম্বর পৃষ্ঠায় সরকার সাহাবুদ্দিন আহমদ প্রশ্ন করেছেন, “কেন তড়িঘড়ি করে জহির রায়হানের হত্যাকারী হিসাবে সন্দেহভাজন রফিককে সপরিবারে আমেরিকা পাঠিয়ে দেয়া হলো? রফিক কে ছিলেন/ কি তার রাজনৈতিক পরিচয়?

প্রশ্ন হলো, ৩০ শে জানুয়ারি জহির রায়হান বুদ্ধিজীবী হত্যার নীল নকশা ও মুক্তিযুদ্ধের সময়কালের একটি রাজনৈতিক নেতাদের গোপন কিছু দুর্লভ তথ্য প্রমাণ প্রেসক্লাবে উপস্থাপন করার ঘোষণা দেয়ায় সেদিন তাকে শহিদুল্লাহ কায়সারের কথা বলে সুপরিকল্পিতভাবেই কি মিরপুরে নিয়ে যাওয়া হয়েছিলো? শেখ মুজিব কি শহীদুল্লাহ কায়সার কিংবা জহির রায়হানের খোঁজের ব্যাপারে আন্তরিক ছিলেন?

এতো দিবস বাংলাদেশে পালিত হয়। এই সরকার মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে এতো বাণিজ্য করে অথচ জহির রায়হানের মতো একজন মানুষের মৃত্যুদিবস গেলো ৩০ জানুয়ারী কেউ তাকে স্মরণ করলোনা। এর কারণ, জহির রায়হানকে স্মরণ করলে মুক্তিযুদ্ধে আওয়ামী লীগের অনেক অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় কলকাতার সোনাগাছিতে তোফায়েলসহ কে কি করতেন সব বেরিয়ে যাবে এসব কারণেই জহির রায়হানকে আলোচনায় উৎসাহ নেয় শেখ হাসিনা এবং তার সাঙ্গপাঙ্গ মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ব্যাবসায়ীদের।

Leave a Reply

Go Top
%d bloggers like this: