দলীয় বিচারপতিদের দিয়ে যেভাবে নিজের নামে থাকা ১৫টি মামলা প্রত্যাহার করিয়ে নেয় শেখ হাসিনা

ডেইলিবিডিটাইমস রিপোর্ট : উচ্চ আদালতে দলীয় নেতাদের বিচারপতি নিয়োগ দিয়ে মাত্র তিনমাসে নয়টি মামলা এবং ক্ষমতার অপব্যবহার করে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ছয়টি মামলা নিজের নাম থাকা মোট ১৫ টি মামলা প্রত্যাহার করিয়ে নেন শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগ যখনি ক্ষমতায় আসে তারা নিম্ন আদালত কিংবা উচ্চ আদালত সব আদালতকেই দলীয় প্রতিষ্ঠানের মতো ব্যবহার করে। ফখরুদ্দিন-মঈনুদ্দিনের সঙ্গে ষড়যন্ত্রের পথ ধরে শেখ হাসিনা ২০০৯ সালে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার সময় তার বিরুদ্ধে আদালতে মোট ১৫টি মামলা ছিলো। তবে একটি মামলায়ও তাকে আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়নি। প্রধানমন্ত্রী পদের ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি নিজের নাম থাকা প্রতি মামলা প্রত্যাহার করিয়ে নেন।

তথ্যমতে, বিলুপ্ত দুর্নীতি দমন ব্যুরো বর্তমানে দুদক শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে মোট ৯টি মামলা করে। এরপর ২০০৭ সালের ১১ জানুয়ারীর পর মঈন-ফখরুদ্দিন সরকারের অনিয়মতান্ত্রিক সরকারের শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা হয় আরো ৬টি মামলা। সবমিলিয়ে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগে মোট ১৫টি মামলা ছিল। শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এসেই তার নিজের বিরুদ্ধে দায়ের করা সকল মামলা প্রত্যাহার করে নেয়। ১৫টি মামলার ৬টি রাজনৈতিক বিবেচনায় প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। আর হাইকোর্টের মাধ্যমে বাতিল করিয়ে নেয়া হয় ৯টি মামলা।

২০১০ সালের ৩ মার্চ থেকে শুরু করে ৩০ মে পর্যন্ত মাত্র তিন মাসেই ৯টি দুর্নীতি মামলা বাতিল করে হাইকোটের দুটি বেঞ্চ। সেই সময় এই দুটি বেঞ্চের একটি বেঞ্চের বিচারপতি ছিলেন বিচারপতি মো. শামসুল হুদা ও বিচারপতি আবু বকর সিদ্দিকী এবং অপর বেঞ্চের বিচারপতি ছিলেন এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক এবং বিচারপতি বোরহান উদ্দিন। এই দুই বেঞ্চের দুই সিনিয়র বিচারপতি ছিলেন দুই শামসু।

শেখ হাসিনা ক্ষমতা ছাড়ার মাত্র পাঁচ মাস আগে ২০০১ সালের ফেব্রুয়ারিতে গোপালগঞ্জের আওয়ামি লীগ নেতা মোহাম্মদ শামসুল হুদা এবং যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগ নেতা এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরীকে অতিরিক্ত বিচারপতি হিসেবে নিয়োগ দিয়ে যায়। নিয়ম অনুযায়ী দুই বছর পর রাষ্ট্রপতি তাদের চাকুরী স্থায়ী করতে পারেন আবার নাও পারেন। তাদের অস্থায়ী নিয়োগ দু’ বছর হলে ২০০৩ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকার তাদের স্থায়ী নিয়োগ স্থায়ী করেনি। এরপর ২০০৯ সালে শেখ হাসিনা ক্ষমতায় এলে এই বিচারপতিদের ভাগ্য খুলে যায়। আদালতের একটি রায়ের দোহাই দিয়ে ২০০৯ সালের ২২ মার্চ তারা হাইকোর্টে বিচারপতি হিসেবে পুনরায় স্থায়ী নিয়োগ পান। ফলে দেখা যায়, শেখ হাসিনার প্রতিও এই বিচারপতিদের কৃতজ্ঞতার শেষ ছিলোনা।

শেখ হাসিনার আমলে বিচারপতি হিসেবে পুনর্বহাল হওয়া এই দুই বিচারপতির একজন বিচারপতি শামসুল হুদার বেঞ্চে মাত্র তিনমাসে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা ৫টি মামলা বাতিল করে দেয়া হয়। এই পাঁচটি মামলা হলো, ফ্রিগেট (যুদ্ধজাহাজ) ক্রয় দুর্নীতি মামলা, মেঘনা ঘাট বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুর্নীতি মামলা, নাইকো দুর্নীতি মামলা এবং ভাসমান বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুর্নীতি মামলা এবং বেপজায় পরামর্শক নিয়োগের মামলা।

ঠিক একই সময়ে হাইকোর্টের অপর বেঞ্চের সিনিয়র বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিকও মাত্র তিন মাসের মধ্যে শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দুর্নীতির চারটি মামলা বাতিল করে দিয়েছিলেন। এই চারটি মামলা হলো, নভোথিয়েটার দুর্নীতি সংক্রান্ত তিনটি মামলা এবং মিগ যুদ্ধ বিমান ক্রয় দুর্নীতি মামলা।

তিনমাসে নয়টি দুর্নীতি মামলা বাতিল করে দেয়া দুই শামসুর রাজনৈতিক পরিচয়

বিচারপতি শামসুল হুদা ::: তার গ্রামের বাড়ি গোপালগঞ্জের টুঙ্গিপাড়া উপজেলায়। শামসুল হুদা প্রায় ১৯ বছর গোপালগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। একবার উপজেলা নির্বাচনেও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন। ক্ষমতালোভী এই শামসুল হুদা এরশাদের পতনের আগে একদফা জাতীয় পার্টিতে যোগ দেন. এবং জেলা পরিষদ চেয়ারম্যানের দায়িত্ব লাভ করেন।

এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক ::: যুক্তরাজ্যের নাগরিক এই মানিক বিদেশে টাকা পাচারের সঙ্গে জড়িত। ২০১৫ সালে ইন্ডিপেন্ডেন্ট টেলিভিশনের সঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি নিজেকে যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগের প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক হিসেবে পরিচয় দেন। যুক্তরাজ্য আওয়ামী লীগের ব্যানারেও তিনি নিয়মিত সভা সমাবেশ করেছেন। এমনকি যুক্তরাজ্য আওয়ামীলীগ এবং আওয়ামী আইনজীবী পরিষদের সঙ্গে বিরোধের জের ধরে বিচারপতি থাকার পরও একাধিকবার তিনি লন্ডনে প্রহারের শিকার হয়েছেন।

হাসিনার বিরুদ্ধে মামলার বিবরণ

বেপজায় পরামর্শক নিয়োগে দুর্নীতি : রাষ্ট্রের ২ কোটি ১০ লাখ ১ হাজার ৬৮৮ টাকা ক্ষতিসাধনের অভিযোগে ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন ব্যুরো শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে এ মামলাটি দায়ের করেছিলো। ২০১০ সালের ৩০ মে এই মালাটি বাতিল করে দেয় গোপালগঞ্জ আওয়ামিলীগের সাবেক নেতা ও বিচারপতি মোহাম্মদ শামসুল হুদা।

ফ্রিগেট ক্রয় দুর্নীতি মামলা : দুর্নীতি ও অনিয়মের মাধ্যমে দক্ষিন কোরিয়া থেকে পুরাতন যুদ্ধজাহাজ ক্রয় করে রাষ্ট্রের ৪৪৭ কোটি টাকার ক্ষতি করার অভিযোগে ২০০২ সালের ৭ ই আগষ্ট শেখ হাসিনাসহ ৫ জনকে আসামি করে মামলাটি দায়ের করেছিলো দুর্নীতি দমন ব্যুরো। ২০১০ সালের ১৮ মে হাইকোর্টে এই মামলাটি বাতিল করে দেন গোপালগঞ্জ আওয়ামিলীগের সাবেক নেতা ও বিচারপতি মোহাম্মদ শামসুল হুদা।

মেঘনা ঘাট বিদ্যুৎ কেন্দ্র দুর্নীতি মামলা : অবৈধভাবে কাজ দিয়ে রাষ্ট্রের ১৭ কোটি ৮৯ লাখ টাকা ক্ষতি করার অভিযোগে ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন ব্যুরো। ২০১০ সালের ২২ এপ্রিল এই দুর্নীতির মামলাটি খারিজ করে গোপালগঞ্জ আওয়ামিলীগের সাবেক নেতা ও বিচারপতি মোহাম্মদ শামসুল হুদা।

খুলনায় ভাসমান বিদ্যুৎ কেন্দ্র সংক্রান্ত দুর্নীতি মামলা : বঙ্গবন্ধু মেমোরিয়াল ট্রাস্টের নামে তিন কোটি টাকা চাঁদা নিয়ে খুলনায় ভাসমান বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে দ্বিতীয় দরদাতাকে কাজ দেয়ার অভিযোগে শেখ হাসিনাসহ ছয় জনের বিরুদ্ধে ২০০৭ সালের ২ সেপ্টেম্বর তেজগাঁও থানায় মামলা করে মইন-ফখরুদ্দীন আমলের দুদক। এই চাঁদাবাজি মামলায় ২০০৮ সালের ১৮ মে অভিযোগ গঠনের পর বিশেষ জজ আদালতে মামলার সাক্ষগ্রহণ শুরু হয়েছিলো। ২০১০ সালের ১৩ এপ্রিল এ মামলাটি বাতিল করে দেয় গোপালগঞ্জ আওয়ামিলীগের সাবেক নেতা ও বিচারপতি মোহাম্মদ শামসুল হুদা।

নাইকো দুর্নীতি মামলা : রাষ্ট্রের ১৩ হাজার ৬৩০ কোটি ৫০ লাখ টাকা ক্ষতি করার অভিযোগে ফখরুদ্দিন সরকারের সময় ২০০৭ সালের ৯ ডিসেম্বর শেখ হাসিনাসহ সাতজনের বিরুদ্ধে এ মামলাটি দায়ের করেছিলো দুদক। ২০১০ সালের ১১ মার্চ এ মামলাটি বাতিল করে দেয় গোপালগঞ্জ আওয়ামিলীগের সাবেক নেতা ও বিচারপতি মোহাম্মদ শামসুল হুদা।

৮টি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয় দুর্নীতি মামলা : নীতিমালা লঙ্ঘন করে রাশিয়া থেকে ৮টি মিগ-২৯ যুদ্ধবিমান ক্রয় করে রাষ্ট্রের প্রায় ৭০০ কোটি টাকা ক্ষতিসাধন করার অভিযোগে ২০০১ সালের ১১ ডিসেম্বর এ মামলাটি দায়ের করে দুর্নীতি দমন ব্যুরো। এ মামলায় ২০০৮ সালের ২০ আগষ্ট শেখ হাসিনাসহ ৬ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করে আদালত। এ মামলার বিরুদ্ধে শেখ হাসিনার দায়ের করা একটি কোয়াশমেন্ট আবেদন আদালত খারিজ করে দিয়ে বলা হয় এই মামলাটি নিম্ন আদালতে চলতে। প্রধান বিচারপতি এম রুহুল আমিনের নেতৃত্বে ৭ বিচারপতির ফুল আপিলেট ডিভিশন এই রায় দেয়। ফলে বিশেষ জজ আদালতে মামলার কার্যক্রম শুরু হয়। ২০১০ সালের ৯ মার্চ শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে দায়ের করা মিগ-২৯ যুদ্ধ বিমান ক্রয়ে দুর্নীতি মামলাটি বাতিল করে দেয় যুক্তরাজ্য ছাত্রলীগের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।

বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার নির্মাণ দুর্নীতি মামলা : জাতির জনক মাওলানা ভাসানীর নাম পরিবর্তন করে বঙ্গবন্ধু নভোথিয়েটার নির্মাণে প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগে দুর্নীতি, অ বৈধভাবে ব্যয় বৃদ্ধি করে রাষ্ট্রের ৫২ কোটি টাকা ক্ষতিসাধন করার অভিযোগে ২০০২ সালের ২৭ মার্চ তেজগাঁও থানায় তিনটি মামলা দায়ের করে দুর্নীতি দমন ব্যুরো। ২০১০ সালের ৪ মার্চ তিনটি মামলা বাতিল করে দেন যুক্তরাজ্য ছাত্রলীগের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী মানিক।

শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হিসেবে ক্ষমতার অপব্যাবহার করে নিজের নামে থাকা ১৫টি মামলার মধ্যে নয়টি মামলা দুই শামসু বিচারপতিকে দিয়ে এবং বাকি ছয়টি মামলা রাজনৈতিক হয়রানিমূলক আখ্যা দিয়ে এভাবেই প্রত্যাহার করে নেন বর্তমান ব্যাংক ডাকাত সরকারের প্রধানমন্ত্রী বঙ্গকসাই শেখ হাসিনা। ।

Leave a Reply

Go Top
%d bloggers like this: