Warning: count(): Parameter must be an array or an object that implements Countable in /customers/4/a/c/dailybdtimes.com/httpd.www/wp-includes/post-template.php on line 284

কামাল লোহানীর প্রশ্ন : ‘২৫ মার্চ শেখ মুজিব এরেস্ট হয়ে জেলখানায় সংলাপের মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন?

বিশেষ প্রতিবেদন : : [১৯৭১ সালের ৭ মার্চ শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেননি। ‘এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’ হুঙ্কার দিয়ে ২৫ মার্চ পর্যন্ত তিনি পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের সঙ্গে আলোচনায় ব্যস্ত ছিলেন পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য। শেখ মুজিবকে আলোচনায় ব্যস্ত নরঘাতক ইয়াহিয়া খান পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশ ভূখণ্ডে অর্থাৎ তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে লক্ষাধিক সৈন্য সমাবেশ ঘটায়। অথচ সব মিলিয়ে ৭ মার্চ বাংলাদেশে ১০ হাজারের বেশি পাকিস্তানী সৈন্য ছিলোনা। ঢাকায় কেন এতো সৈন্য সমাবেশ ঘটানো হচ্ছে একবারের জন্যও আপত্তি কিংবা উদ্বেগ প্রকাশ করেননি শেখ মুজিব। কেন করেননি ? এসব প্রশ্নের জবাব এখনো মেলেনি। ৭ মার্চের পর শেখ মুজিবের রহস্যজনক ভূমিকা নিয়ে অনেক লেখক সাংবাদিকের বইতেও এ নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। বিশিষ্ট সাংবাদিক কামাল লোহানী তার লেখা ‘রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলা বেতার’ বইতেও এ নিয়ে উষ্মা প্রকাশ করেছেন। তিনি লিখেছেন ‘নাকি তিনি (শেখ মুজিব) এরেস্ট হয়েও জেলখানায় সংলাপের মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন?”…….কামাল লোহানীর বইয়ের ৭০-৭১ পৃষ্ঠা থেকে চিন্তাশীল পাঠকদের জন্য খানিকটা উদ্ধৃতি……..]

“… ইতোমধ্যেই জনপ্রিয়তার তুঙ্গে উঠে যিনি বঙ্গবন্ধু হয়ে উঠেছিলেন তিনি জেনারেল ইয়াহিয়া খানের মুখের বেসরকারি ঘোষণা You are the Next Prime Minister of Pakistan উচ্চারিত হওয়ার পর থেকে সেভাবেই নিজেকে তৈরি করেছিলেন। কিন্তু ঢাকা অধিবেশন বাতিল হলে হোটেল পূর্বাণীর গেটে দাঁড়িয়ে বলেছিলেন, আগামী ৭ মার্চে আমাদের কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। সেদিন ছিল ১ মার্চ এবং নির্বাচনে বিজয়ী আওয়ামী সকল সদস্যদের বৈঠকে বক্তব্য রাখছিলেন বঙ্গবন্ধু। আমার প্রশ্ন ঐ বৈঠকেই তিনি কেন সিদ্ধান্ত নিতে পারলেন না?
পূর্ব বাংলার জনগণ অধিকার হরণের বিরুদ্ধে টগবগ করে ফুটছিলেন। তারই প্রমাণ সারা পূর্ব বাংলার গণজাগরণ। ৭ মার্চের ঢাকা শহর, চতুর্দিকে মুখরিত জনগণের শ্লোগানে। ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধর, বাংলাদেশ স্বাধীন কর’, ‘পদ্মা মেঘনা যমুনা তোমার আমার ঠিকানা’। লোকে লোকারণ্য। তিলধারণের ঠাঁই নেই রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমান সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে)। জনগণের মহান নেতা সভায় এলেন নির্ধারিত সময়ের অনেক পরে। লিখিত যে বক্তব্য তার পড়বার কথা ছিল, তা তিনি রেখে স্বত:স্ফূর্ত বক্তব্য রাখলেন আবেগপূর্ণ, প্রতি লাইনে করতালিমুখর। সিদ্ধান্তমূল বাক্য শেষে শ্লোগান মুখরিত হচ্ছিল জনসমুদ্র।
তিনি উচ্চারণ করলেন, ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম’। তিনি ‘ঘরে ঘরে দূর্গ গড়ে তুলতে’ নির্দেশ দিলেন। পাড়ায় মহল্লায় ‘আওয়ামী লীগের’ উদ্যোগে প্রতিরোধ কমিটি গড়ে তুলতে বললেন। যার যা আছে, তাই নিয়ে প্রস্তুত হয়ে যাও আহ্বান জানালেন। এই যে সিদ্ধান্তমূলক ঘোষণা শুনছিলাম, তার কোনটাতেই ‘আজ থেকে কিংবা এই মুহূর্ত থেকেই আমরা স্বাধীন’, এমন উচ্চারণ ছিল না। অথবা বললেন না, ‘আমি স্বাধীনতার যুদ্ধ ঘোষণা করছি’। সরাসরি না বললেও এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম আমাদের স্বাধীনতার সংগ্রাম এই বাক্যটিকেই উপস্থিত জনতা বুকে ধারণ করে রণক্ষেত্রে যাবার প্রস্তুতি গ্রহণ করলেন।
কিন্তু নেতার কর্মকান্ডে হোঁচট খেতে হলো। জেনারেল ইয়াহিয়া খানের প্রস্তাব গোলটেবিলে বসা তিনি মেনে নিলেন। সচেতন নাগরিকদের প্রশ্ন ছিল, ৭ মার্চের পর আবার পাকিস্তানি শাসকদের সাথে কিসের বৈঠক? ৭ মার্চের প্রায় দু’সপ্তাহ পরে জেনারেল ইয়াহিয়া ঢাকা এলেন গোলটেবিল করতে। বঙ্গবন্ধুও বসলেন পূর্ব পাকিস্তান হাউসে। যে গাড়িটা করে যাচ্ছিলেন তাতে কালো পতাকা উড়িয়েই যেতেন। নিজেও কালো ব্যাজ পরতেন। বৈঠক হলো কয়েকদিন। সম্ভবত: ২২, ২৩, ২৪ মার্চ। প্রতিদিনই ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলো বৈঠক। ২৫ মার্চ ইয়াহিয়া ঢাকা ত্যাগ করল। মাঝরাতে গণহত্যা শুরু করল পাকিস্তানি সেনাবাহিনী।
সবার ধারনা, পশ্চিম পাকিস্তান থেকে সেনাসদস্য ও অস্তশস্ত্র নিয়ে আসার জন্যই এই গোলটেবিল চক্রান্ত। যেখানে Point of no return সেখানে বৈঠক করে কি হবে? তবু কেন বঙ্গবন্ধু বৈঠকে বসতে রাজি হলেন বা ওরা যে কৌশলে সময় নিল প্রস্তুতি করার, তা কি তিনি বুঝতে পারেননি? আবার গোলটেবিল বৈঠক ব্যর্থ হবার পর তিনি সবাইকে সরে যেতে বললেও নিজে ধানমন্ডি ৩২ নম্বর বাড়িতে কেন থেকে গেলেন? কেনইবা মহান মুক্তিযুদ্ধের সর্বাধিনায়ক হয়েও শত্রুপক্ষের হাতে ধরা দিলেন? এসব প্রশ্ন সহজেই উঠছে। যার কোন যথার্থ জবাব মেলেনি।
বঙ্গবন্ধুকে জিজ্ঞেস করেছিলাম, তিনি জবাবে বলেছিলেন, ‘আমি ধরা না দিলে বাংলার মাটি শ্মশানে পরিণত হতো’, কিন্তু ধরা দেবার পরও যা হয়েছে তা কি শ্মশানের চেয়ে কম? তবু তাকে ধরতে প্রতিপক্ষ নানাভাবে অভিযান চক্রান্ত চালাতে থাকে। কিন্তু বিপ্লবের নেতা জনগণের মধ্যে থেকে মুক্তিযুদ্ধের নেতৃত্ব দেন। এটাই দুনিয়াজোড়া রীতি। তিনি কেন ভাঙলেন এই রীতি, এটা বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। নাকি তিনি এরেস্ট হয়েও জেলখানায় সংলাপের মাধ্যমে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হতে চেয়েছিলেন?”
– কামাল লোহানী / রাজনীতি মুক্তিযুদ্ধ স্বাধীন বাংলা বেতার ॥ [ভূমিকা – ফেব্রুয়ারি, ২০১২ । পৃ: ৭০-৭১]

Leave a Reply

Go Top
%d bloggers like this: