‘২৫ মার্চ স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছিলেন শেখ মুজিব’ …..শারমিন আহমেদ

‘‘ ২৫ মার্চ সন্ধ্যায় ইয়াহিয়া খান গোপনে ঢাকা ত্যাগ করলেন।  আলোচনার আবরনে অপারেশন সার্চলাইট গণহত্যার নীল নকশা তখন সম্পন্ন । পুর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ি ২৫ মার্চের ভয়াল কালোরাতে আব্বু গেলেন মুজিব কাকুকে নিতে । মুজিব কাকু আব্বুর সঙ্গে আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনা করবেন, সেই ব্যাপারে আব্বু মুজিব কাকুর সাথে আলোচনা করেছিলেন। মুজিব কাকু সে ব্যাপারে সম্মতিও দিয়েছিলেন। সেই অনুযায়ী আত্মগোপনের জন্য পুরান ঢাকায় একটি বাসাও ঠিক করে রাখা হয়েছিল। বড় কোন সিদ্ধান্ত সস্পর্কে আব্বুর উপদেশ গ্রহনে মুজিব কাকু এর আগে দ্বিধা করেননি। আব্বুর, সে কারনে বিশ্বাস ছিল যে, ইতিহাসের এই যুগসন্ধিক্ষণে মুজিব কাকু কথা রাখবেন। মুজিব কাকু, আব্বুর সাথেই যাবেন। অথচ শেষ মূর্হুতে মুজিব কাকু অনড় রয়ে গেলেন। তিনি আব্বুকে বললেন, ‘ বাড়ি গিয়ে নাকে তেল দিয়ে ঘুমিয়ে থাকো, পরশুদিন (২৭ মার্চ) হরতাল ডেকেছি।’ মুজিব কাকুর তাৎক্ষণিক এই উক্তিতে আব্বু বিস্ময় ও বেদনায় বিমূঢ় হয়ে পড়লেন। এদিকে বেগম মুজিব ঐ শোবার ঘরেই সুটকেসে মুজিব কাকুর জামাকাপড় ভাঁজ করে রাখতে শুরু করলেন। ঢোলা পায়জামায় ফিতা ভরলেন। পাকিস্তানী সেনার হাতে মুজিব কাকুর সেচ্ছা বন্দি হওয়ার এইসব প্রস্তুতি দেখার পরও আব্বু হাল না ছেড়ে প্রায় এক ঘন্টা ধরে বিভিন্ন ঐতিহাসিক উদাহরন টেনে মুজিব কাকুকে বুঝাবার চেষ্টা করলেন।…পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী আব্বু স্বাধীনতার ঘোষনা লিখে নিয়ে এসেছিলেন এবং টেপ রেকর্ডার ও নিয়ে এসেছিলেন। টেপে বিবৃতি দিতে বা স্বাধীনতার ঘোষণায় স্বাক্ষর প্রদানে মুজিব কাকু অস্বীকৃতি জানান। কথা ছিল যে, মুজিব কাকুর স্বাক্ষরকৃত স্বাধীনতার ঘোষণা হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (বর্তমানে শেরাটন) অবস্থিত বিদেশী সাংবাদিকদের কাছে পৌঁছে দেওয়া হবে এবং তাঁরা আন্ডারগ্রাউন্ডে গিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ পরিচালনা করবেন। আব্বু বলেছিলেন, ‘মুজিব ভাই, এটা আপনাকে বলে যেতেই হবে, কারন কালকে কী হবে, আমাদের সবাইকে যদি গ্রেফতার করে নিয়ে যায়, তা হলে কেউ জানবে না, কী তাদের করতে হবে। এই ঘোষনা কোন না কোন জায়গা থেকে কপি করে আমরা জানাব। যদি বেতার মারফত কিছু করা যায়, তা হলে সেটাই করা হবে। ’ মুজিব কাকু তখন উত্তর দিয়েছিলেন, ‘ এটা আমার বিরুদ্ধে দলিল হয়ে থাকবে। এর জন্য পাকিস্তানীরা আমাকে দেশদ্রোহের জন্য বিচার করতে পারবে। ’ আব্বুর লেখা ঐ স্বাধীনতা ঘোষনারই প্রায় হুবহু কপি পরদিন আর্ন্তজাতিক মিডিয়ায় প্রচারিত হয়। ধারনা করা যায় যে, ২৫ মার্চের কয় দিন আগে রচিত এই ঘোষনাটি আব্বু তাঁর আস্থাভাজন কোন ছাত্রকে দেখিয়ে থাকতে পারেন। স্বাধীনতার সমর্থক সেই ছাত্র হয়তো স্ব-উদ্যোগে বা আব্বুর নির্দেশেই স্বাধীনতার ঘোষনাটি বর্হিবিশ্বের মিডিয়ায় পৌঁছে দেন। মুজিব কাকুকে আত্মগোপন বা স্বাধীনতা ঘোষণায় রাজি করাতে না পেওে রাত নয়টার দিকে আব্বু ঘরে ফিরলেন। ”
[তাজউদ্দীন আহমদ নেতা ও পিতা, তৃতীয় পর্ব( দুর্বার প্রতিরোধ), শারমিন আহমদ, পৃষ্ঠা ৪৫, ৪৬ (১ম পেপারব্যাক সংস্করণ ]

Leave a Reply

Go Top
%d bloggers like this: