ক্যাটাগরি ধর্ম ও জীবন

  • কতটুকু সম্পদ থাকলে কোরবানি ওয়াজিব হবে

    কতটুকু সম্পদ থাকলে কোরবানি ওয়াজিব হবে

    ইসলামী ডেস্ক:

    ত্যাগ, আনুগত্য ও তাকওয়ার মহিমান্বিত উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা। ঈদুল আজহার অন্যতম প্রধান ইবাদত কোরবানি। কোরবানি শুধু পশু জবাইয়ের নাম নয়; বরং কোরবানির সঙ্গে মিশে আছে আল্লাহর প্রতি নিঃশর্ত ভালোবাসা, আত্মত্যাগের চেতনা এবং হজরত ইব্রাহিম (আ.) ও তার পুত্র ইসমাইল (আ.)-এর অনুপম ত্যাগ ও আনুগত্যের স্মৃতি।

    পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ ঘোষণা করেন, অতএব তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে নামাজ আদায় করো এবং কোরবানি করো। (সুরা কাওসার, আয়াত : ২)

    এ থেকে বোঝা যায়, কোরবানির মূল উদ্দেশ্য হলো ইখলাস ও আল্লাহভীতি অর্জন।

    হাদিস শরীফেও কোরবানির গুরুত্ব তুলে ধরা হয়েছে। সাহাবি আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, যার সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও সে কোরবানি করে না, সে যেন আমাদের ঈদগাহের কাছেও না আসে। (সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস : ২১২৩)

    অন্য হাদিসে এসেছে , আদম সন্তানের জন্য কোরবানির দিনের আমলসমূহের মধ্যে আল্লাহর কাছে সবচেয়ে প্রিয় হলো কোরবানি করা। (তিরমিজি)

    ইসলামের দৃষ্টিতে কোরবানি একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত, যা নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ সাপেক্ষে সামর্থ্যবান মুসলিম নর-নারীর ওপর ওয়াজিব। এখানে সামর্থ্যবান বলতে সেই ব্যক্তিকে বোঝানো হয়েছে, যার কাছে নিসাব পরিমাণ সম্পদ রয়েছে।

    কোরবানির জন্য নিসাব পরিমাণ সম্পদ কতটুকু

    ১০ জিলহজ সুবহে সাদিক থেকে ১২ জিলহজ সূর্যাস্ত পর্যন্ত যেই প্রাপ্তবয়ষ্ক, সুস্থ মস্তিষ্ক মুকিম মুসলিম নারী ও পুরুষের কাছে প্রয়োজনের অতিরিক্ত নেসাব পরিমাণ সম্পদ থাকবে তার ওপর কোরবানি ওয়াজিব হবে।
    নেসাব হল,  স্বর্ণের ক্ষেত্রে সাড়ে সাত (৭.৫) ভরি। রুপার ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন (৫২.৫) ভরি। অন্যান্য বস্তুর ক্ষেত্রে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার সমমূল্যের সম্পদ।

    স্বর্ণ বা রুপার কোনো একটি যদি পৃথকভাবে নেসাব পরিমাণ না হয় তবে স্বর্ণ-রুপা উভয়টি মিলে কিংবা এর সাথে প্রয়োজন-অতিরিক্ত অন্য বস্তুর মূল্য মিলে সাড়ে বায়ান্ন ভরি রুপার সমমূল্যের হয়ে যায়, তাহলে কোরবানী ওয়াজিব হবে।

    স্বর্ণ-রুপার অলঙ্কার, নগদ অর্থ, বাৎসরিক খোরাকীর জন্য প্রয়োজন হয় না এমন জমি এবং প্রয়োজন অতিরিক্ত আসবাবপত্র—সবই কোবানির নেসাবের ক্ষেত্রে হিসাবযোগ্য। ফিকহের নির্ভরযোগ্য কিতাব আল মুহিতুল বুরহানিতেও এই মাসআলা উল্লেখ রয়েছে।

    সহজভাবে বলা যায়, যার ওপর যাকাত ফরজ হয়, তার ওপর কোরবানিও ওয়াজিব। তবে যাকাতের মতো এখানে এক বছর অতিক্রান্ত হওয়া (হাওল) শর্ত নয়; বরং কোরবানির দিনগুলোতে নিসাব পরিমাণ সম্পদের মালিক হলেই কোরবানি ওয়াজিব হয়ে যায়।

    বি/ এ

  • আরবের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়

    আরবের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়

    ডেস্ক নিউজ : ইতিহাসের ধুলোমাখা পাতায় বাগদাদ যেন এক রূপকথার নগরী। দজলা নদীর তীরে গড়ে ওঠা এই শহর একসময় ছিল বিশ্বসভ্যতার কেন্দ্রভূমি। যখন ইউরোপ অন্ধকারের অতল গহ্বরে নিমজ্জিত, চীনের ঐশ্বর্য পৃথিবীর কাছে প্রচ্ছন্ন, ভারতে সবে প্রতিষ্ঠা হচ্ছে গৌরবময় মুসলিম শাসন, তখন আব্বাসী খলিফাদের পৃষ্ঠপোষকতায় বাগদাদে জ্বলছিল প্রদীপ্ত জ্ঞানশিখা। সেই শিখার উজ্জ্বলতম আধারটির নাম মুসতানসিরিয়া মাদরাসা। এটি শুধু একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ছিল না, বরং এটি ছিল আরব জাহানের প্রথম পূর্ণাঙ্গ আবাসিক বিশ্ববিদ্যালয়।

    প্রতিষ্ঠার প্রেক্ষাপট

    হিজরি সপ্তম শতাব্দীর শুরুর কথা। আব্বাসী খেলাফতের তখন শেষ বিকাল, তবু সাংস্কৃতিক ও জ্ঞানতাত্ত্বিক ঐতিহ্যে বাগদাদ তখনো বিশ্বের মধ্যে অনন্য। ৬২৩ হিজরিতে খিলাফতের দায়িত্ব গ্রহণের পরে খলিফা আল-মুসতানসির বিল্লাহ উপলব্ধি করলেন, জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চা ও পাঠদানের কার্যক্রমকে সুসংহত করতে বহুমুখী সুবিধা-সংবলিত একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা প্রয়োজন। খলিফা মুসতানসির বিল্লাহ এমন একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে চেয়েছিলেন, যা হবে জ্ঞান-বিজ্ঞানচর্চার সব শাখা-প্রশাখা বা স্কুল অব থটের সমন্বয়ক। যেখানে ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি আধুনিক বিজ্ঞানেরও নিরবচ্ছিন্ন চর্চা হবে।

    ৬২৫ হিজরি (১২২৭ খ্রি.) সনে দজলা নদীর পূর্বতীরে মুসতানসিরিয়া মাদরাসার নির্মাণকাজ শুরু হয়ে ৬৩১ হিজরিতে (১২৩৪ খ্রি.) নির্মাণকাজ শেষ হয়। উৎসবমুখর আয়োজনে মাদরাসাটির উদ্বোধন করা হয়। ১৬০টি উটের পিঠে চাপিয়ে দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ও বইপত্র মাদরাসার লাইব্রেরিতে আনা হয়।

    বৈচিত্র্যময় পাঠ্যক্রম

    মুসতানসিরিয়া মাদরাসার অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল এর আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ পাঠ্যক্রম। এটি শুধু ধর্মীয় শিক্ষাকেন্দ্র না, বরং সেখানে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের কাঠামো বিদ্যমান ছিল। এই প্রতিষ্ঠানে দক্ষ বিচারক, কূটনীতিক, চিকিৎসক, গণিতবিদসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পারদর্শী ব্যক্তিত্ব গড়ে তোলা হতো।

    ধর্মীয় বিজ্ঞান ও ভাষা-সাহিত্য : কোরআনের তাফসির, হাদিসচর্চা ও ফিকহ (ইসলামি আইন শাস্ত্র) ছিল ধর্ম-শিক্ষার মূল সাবজেক্ট। এই প্রতিষ্ঠানের অনন্যতা ছিল, ইসলামি আইন শাস্ত্রের চারটি স্কুল অব থটের (মাজহাব) সমন্বিত পাঠদান। আরবি ব্যাকরণ এবং উচ্চতর অলংকার শাস্ত্রও পাঠ্যক্রমের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

    প্রাকৃতিক ও গাণিতিক বিজ্ঞান : পাটিগণিত, জ্যামিতি ও জ্যোতির্বিজ্ঞান মুসতানসিরিয়া মাদরাসার পাঠ্যক্রমের অন্যতম প্রধান বিষয় ছিল।

    চিকিৎসাশাস্ত্র : মাদরাসার দক্ষিণ-পূর্ব প্রান্তে একটি বিশেষ চিকিৎসা বিভাগ প্রতিষ্ঠিত ছিল ‘বিমারিস্তান’ বা হাসপাতাল নামে। সেখানে হাতে-কলমে শিক্ষার্থীদের চিকিৎসা পদ্ধতি শেখানো হতো।

    এছাড়া আরো অনেক বিষয় মাদরাসার শিক্ষা-কারিকুলামের অন্তর্ভুক্ত ছিল।

    আবাসিক ব্যবস্থাপনা

    মুসতানসিরিয়া মাদরাসার আবাসিক ব্যবস্থা ছিল সুশৃঙ্খল ও নিয়মতান্ত্রিক। উন্নত বিশ্বের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর স্কলারশিপ কর্মসূচির সঙ্গে এর উল্লেখযোগ্য সাদৃশ্য দেখা যায়। খলিফা মুসতানসির বিল্লাহর পৃষ্ঠপোষকতায় এখানে শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের জন্য পূর্ণাঙ্গ সুযোগ-সুবিধার নিশ্চয়তা ছিল এবং পাঠ গ্রহণের পরিবেশও ছিল অত্যন্ত মনোরম।

    প্রতিটি শাস্ত্রের শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক ব্লক ও সুসজ্জিত কক্ষের ব্যবস্থা ছিল। প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে নির্ধারিত কক্ষ, মাদুর ও গালিচা সরবরাহ করা হতো। মাদরাসার রান্নাঘরে প্রতিদিন উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হতো।

    মাদরাসার লাইব্রেরিতে প্রায় ৮০,০০০ দুর্লভ পাণ্ডুলিপি ছিল। সেখানে আরামদায়ক বসার ব্যবস্থা এবং রাতে পড়াশোনার জন্য পর্যাপ্ত আলোর সুবিধা ছিল।

    শিক্ষার্থীদের প্রতি মাসে এক দিনার করে ভাতা দেওয়া হতো। পাশাপাশি সাবান, তেল, লেখার কাগজসহ প্রয়োজনীয় সামগ্রীর খরচও বহন করা হতো। অসুস্থদের জন্য সার্বক্ষণিক চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থাও ছিল।

    মুসতানসিরিয়া মাদরাসা ছিল এতিমবান্ধব একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান। এখানে এতিম শিশুদের জন্য ছিল আলাদা ‘দারুল কোরআন’। শিক্ষার্থীদের একমাত্র কাজ ছিল রুটি-রুজির চিন্তা না করে জ্ঞানার্জনে নিমগ্ন থাকা।

    মুসতানসিরিয়ার প্রাণপুরুষ

    মুসতানসিরিয়া মাদরাসা শুধু ইটপাথরের কোনো কাঠামো ছিল না; এর আসল প্রাণ ছিলেন বরেণ্য শিক্ষকরা। মাদরাসার পরিচালক মহিউদ্দিন আবুল মাহাসিন ইউসুফ ইবনুল জাওজি ছিলেন সবচেয়ে আলোচিত এবং আলোকিত ব্যক্তি। মিসরের সুলতান আলকামিল তার জ্ঞান ও প্রজ্ঞা সম্পর্কে বলেছেন, ‘দুনিয়ার মানুষের জ্ঞানবুদ্ধির ঘাটতি থাকলেও মহিউদ্দিনের জ্ঞানবুদ্ধি ছিল অনেক বেশি। এই জিনিসটা তার আরেকটু কম হলেই বরং ভালো হতো।’

    শেষ পরিণতি

    ৬৫৬ হিজরির (১২৫৮ খ্রি.) মোঙ্গল সেনাপতি হালাকু খান বাগদাদ অবরোধ করে, তখন ইবনুল জাওজি খলিফার দূত হিসেবে মোঙ্গল শিবিরে গিয়ে শান্তি স্থাপনের চেষ্টা করেন। কিন্তু ভাগ্য ছিল নির্মম। তাতাররা শহরে প্রবেশ করে মুসতানসিরিয়ার বিশ্ববিখ্যাত লাইব্রেরির প্রায় ৮০ হাজার দুর্লভ পাণ্ডুলিপি দজলা নদীতে ফেলে দেয়। এই ধ্বংসযজ্ঞের মধ্যেই ইবনুল জাওজি ও তার তিন ছেলে নির্মমভাবে শহীদ হন।

    আজ দজলা নদীর তীরে মুসতানসিরিয়ার জীর্ণ দেয়ালগুলো সেই হারানো গৌরব ও শৌর্যের নীরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—সভ্যতার উত্থান ঘটে জ্ঞানের ভিত্তিতে আর পতন ঘটে তখনই, যখন সেই জ্ঞানকে রক্ষা করার শক্তি ও ঐক্য রাষ্ট্র হারিয়ে ফেলে।

    আর আই খান

  • ইসলামী সংস্কৃতি ও আলোকিত মানুষ

    ইসলামী সংস্কৃতি ও আলোকিত মানুষ

    সংস্কৃতি সাধারণত তাহজিব, তমদ্দুন বা ইংরেজি কালচারের প্রতিশব্দ রূপে ব্যবহৃত হয়। এ সংস্কৃতির মূল লক্ষ্য হচ্ছে মানুষকে চূড়ান্ত সাফল্যের জন্য প্রস্তুত করা। এ হচ্ছে একটি ব্যাপক জীবনব্যবস্থা যা মানুষের চিন্তা-কল্পনা, স্বভাব-চরিত্র, আচার-ব্যবহার, পারিবারিক কাজকর্ম, সামাজিক ক্রিয়াকলাপ, রাজনৈতিক কর্মধারা, সভ্যতা ও সামাজিকতা সবকিছুর ওপরই পরিব্যাপ্ত। এ সংস্কৃতি কোন জাতীয়, বংশীয় বা গোত্রীয় সংস্কৃতি নয়। বরং সঠিক অর্থে এটি হচ্ছে মানবীয় সংস্কৃতি। এ সংস্কৃতি এক বিশ্বব্যাপী উদার- গোত্র, ভাষা নির্বিশেষে সকল মানুষই প্রবেশ করতে পারে। পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে এ সংস্কৃতি এক নির্ভুল সমাজব্যবস্থা কায়েম করতে এবং এক সৎ ও পবিত্র জনসমাজ গড়ে তুলতে চায়। ইসলামী সংস্কৃতির ব্যবস্থাপনা একটি রাজ্যের ব্যবস্থাপনার মতো। এতে আল্লাহর মর্যাদা সাধারণ ধর্মীয় মত অনুসারে নিছক একজন উপাস্যের মত নয়। বরং দুনিয়াবি মত অনুযায়ী তিনি সর্বোচ্চ শাসক ও রাসূল সা. তার প্রতিনিধি। কুরআন তাঁর আইনগ্রন্থ। মানুষ সৃষ্টির সেরা জীব। তার এই শ্রেষ্ঠত্বের মর্যাদা বজায় রাখা ও এই শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণের জন্য তার প্রয়োজন সংস্কৃতি। সংস্কৃতি মানুষের আছে, অন্য জীবের সংস্কৃতি বলে কিছুই নেই। মানুষ হিসেবে মানুষের আসল পরিচয়ই তার সংস্কৃতি। জীবন ধারণের জন্য মানুষ খাবার খেয়ে থাকে, এই খাবার ভাত-রুটি হতে পারে, আবার মাছ-গোশতও হতে পারে। এই খাবার খেয়েই মানুষকে বেঁচে থাকতে হয়; কিন্তু এই ভাত-রুটি বা মাছ-গোশত খাওয়াটাই সংস্কৃতি নয়, সংস্কৃতি হচ্ছে খাবারের পদ্ধতি। আমরা যে পদ্ধতিতে খাবার গ্রহণ করব, সে পদ্ধতিটাই হচ্ছে সংস্কৃতি। অর্থাৎ সংস্কৃতি হচ্ছে জীবন পরিচালনার পদ্ধতি ও প্রক্রিয়ার নাম।

    সংস্কৃতির সংজ্ঞা

    এক কথায় সংস্কৃতির সুনির্দিষ্ট সংজ্ঞা প্রদান সম্ভব নয়। এজন্য প্রয়োজন বিশ্লেষণের। সংস্কৃতি সম্পর্কিত এমন কতকগুলো উদ্ধৃতি পেশ করা হলো যাতে সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি সুষ্ঠু ধারণা অর্জন সহজ হতে পারে। আবুল মনসুর আহমেদ বলেন: “ইংরেজিতে যাকে বলা হয় (Culture/Refinement), আরবিতে যাকে তাহজিব বলা হয়, সংস্কৃতি শব্দটা সেই অর্থে ব্যবহার করা যেতে পারে।” আবুল ফজল বলেন: “ Culture শব্দের ধাতুগত অর্থ কর্ষণ অর্থাৎ সোজা কথায় চাষ করা। জমি রীতিমতো কর্ষিত না হলে যত ভালো বীজই বপন করা হোক না কেন তাতে ভালো ফসল কিছুতেই আশা করা যায় না। মন জিনিসটাও প্রায় জমির মতই। মনের ফসল পেতে হলে তার রীতিমত কর্ষণের প্রয়োজন।” ওয়াকিল আহমেদের ভাষায়: “জীবন ছাড়া সংস্কৃতি নেই।” বদরুদ্দীন উমর বলেন: “জীবন চর্চারই অন্য নাম সংস্কৃতি।” প্রচলিত অর্থে আমরা যাকে সংস্কৃতি বলে থাকি তারও লক্ষ্য মন আর চরিত্রের উৎকর্ষ সাধন। মহত্ত্ব ও সৌন্দর্য সাধনার উপর, এক কথায় মনুষ্যত্বের উপর যে সংস্কৃতির ভিত্তি, একমাত্র সে সংস্কৃতিই মানবজীবনে বিকিরণ করতে পারে আলো। যে আলোর নেই কোনো দেশ, কোনো কাল ও জাত। তাই সংক্ষেপে বলা যায় যে, মানুষের চিন্তার বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে চরিত্র আর চরিত্রের বহিঃপ্রকাশই হচ্ছে সংস্কৃতি।

    সংস্কৃতির ভুল ধারণা 

    আমরা সাধারণ গান, সিনেমা, নাটক, বাদ্যযন্ত্র, শিল্প, সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়কে সংস্কৃতি হিসেবে গণ্য করে থাকি। আসলে এইগুলো ঠিক সংস্কৃতি নয়; বরং সংস্কৃতির বাহন মাত্র। সংস্কৃতি বিকাশের জন্য এগুলো ব্যবহার করা হয় উপকরণ বা বাহন হিসাবে। তাই আমরা ভুলবশত তা অজ্ঞতার কারণে এ উপকরণ বা বাহনকে সংস্কৃতি বলে থাকি। সংস্কৃতিকে শুধু রীতিনীতি কিংবা আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না। মানব মনের অন্তর্নিহিত শক্তি, কৌতূহল ও প্রতিভা স্বতঃস্ফূর্ত বিকাশ লাভ করে সংস্কৃতির মাধ্যমে। এ জন্যই সংস্কৃতির মাধ্যমে মনুষ্যত্বের পরিপূর্ণ বিকাশ ঘটতে পারে। খণ্ড খণ্ড কিংবা আংশিক সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কখনও মানুষকে তার মনুষ্যত্ব বিকাশের সহায়তা করতে পারে না।

    অপসংস্কৃতি

    অপসংস্কৃতি হচ্ছে একটি জাতির সাংস্কৃতিক স্বভাবের বিপরীত অথবা সাংস্কৃতিক আদর্শের বিরুদ্ধে যা মানুষের সুস্থ ও সুপ্ত প্রতিভাকে বিকৃতি ও বিধবস্ত করে তাই হচ্ছে অপসংস্কৃতি। বর্তমান সমাজে অপসংস্কৃতি বলে থাকে চিহ্নিত করতে পারি তা নিম্নবরূপ:

    ১. বিদেশি প্রাচুর্য থেকে সৃষ্ট এক ধরনের অশ্লীল নৃত্যগীত, নাটক ও সিনেমা ইত্যাদি।

    ২. বিদেশি মিডিয়ার কু-প্রভাব।

    ৩. ডিশ এন্টিনার বদৌলতে প্রাইম, স্টার টিভি, জিটিভি, এমটিভি আগ্রাসন।

    ৪. যৌন উত্তেজনামূলক সাহিত্য, পত্রিকা, ম্যাগাজিন, কমিক বই ইত্যাদির মাধ্যমে চরিত্র হরণ করা।

    ৫. ছায়াছবির মাধ্যমে ভায়োলেন্সের চিত্র প্রদর্শন।

    ৬. বিভিন্ন অনুষ্ঠান ও ক্লাবের নামে মাদকের ছড়াছড়ি।

    ৭. পুরুষ ও মহিলাদের বিকৃত রুচির পোশাক পরিধান।

    ৮. অতি আধুনিকতার নামে বিদেশী সংস্কৃতির অনুপ্রবেশ ও অনুশীলন।

    ১০. বিকৃত রুচি ও যৌন সুড়সুড়িমূলক বিজ্ঞাপন, পোস্টার, ফেস্টুন আলোকচিত্র ইত্যাদির ব্যাপক প্রচলন।

    ১১. ধর্মের নামে মাজার পূজা, কবর পূজা, শিরক ও বিদাতের ব্যাপক সয়লাব।

    সুতরাং অপসংস্কৃতি চিহ্নিতকরণের ক্ষেত্রে একটি জাতি বা দেশের ঐতিহ্যকে বিবেচনার আয়ত্তে আনতেই হবে।

    সংস্কৃতি ও ধর্ম

    ধর্ম হচ্ছে সংস্কৃতির একটি উপাদান। ধর্মবিশ্বাসের কারণে সাংস্কৃতিতে বৈচিত্র্য সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা লক্ষ্য করছি যে, ধর্মীয় বিশ্বাস এবং প্রেরণা সংস্কৃতি বিকাশের ক্ষেত্রে কার্যকর ভূমিকা পালন করছে। মুসলমান, হিন্দু, বৌদ্ধ এবং খ্রিষ্টান সকলের ক্ষেত্রেই ধর্মবিশ্বাসটি জীবনের প্রেরণার উৎস। এ দেশের বিভিন্ন উৎসবের উৎস অনুসন্ধান করলে দেখা যাবে যে, সেগুলোর প্রায় সব কয়টিই ধর্মভিত্তিক। ধর্মভিত্তিক হয়েও সকল উৎসব আয়োজনের মধ্যে একটি উদারতা, সহনশীলতা এবং সকল শ্রেণির এক সঙ্গে গ্রহণ করার একটি প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। আর এ কথা বলাই বাহুল্য যে, কোন জিনিস ব্যবহারের ব্যাপারে তার ¯্রষ্টা যে পদ্ধতি নির্দেশ করেন, সেই জিনিস ব্যবহারের সেটাই সর্বোত্তম ও নির্ভুল পন্থা। শুদ্ধ সংস্কৃতি পেতে হলে আমাদের যেতে হবে খোদায়ী দর্শনের কাছে। যিনি আমাদের সৃষ্টি করেছেন, জীবন দিয়েছেন, আহার জোগাচ্ছেন এবং একদিন তাঁর কাছেই আমাদের ফিরে যেতে হবে।

    ইসলাম ও সংস্কৃতি

    ইসলাম পৃথিবীতে নিছক রাজনৈতিক তা অর্থনৈতিক বিপ্লব সাধনের জন্য আসেনি। ইসলাম এসেছে মানুষের চিন্তা ও কর্মকে পরিশুদ্ধ করার জন্য। মানুষের চিন্তা ও কর্মের এ পরিশুদ্ধির প্রচেষ্টাকেই বলা হয় সামগ্রিক অর্থে সাংস্কৃতিক বিপ্লব। ইসলাম একমাত্র পূর্ণাঙ্গ জীবনবিধান। ফলে ইসলাম ছাড়া জীবন পরিচালনা মানেই হচ্ছে, অপূর্ণাঙ্গ বিধান দ্বারা পরিচালিত হওয়া। আর অপূর্ণাঙ্গ বিধান দ্বারা জীবন পরিচালনার অনিবার্য পরিণতি হচ্ছে অসঙ্গতি ও ত্রুটিপূর্ণ জীবন যাপন করা। স্বাভাবিকভাবেই এ জীবন অসংস্কৃতি বা অপসংস্কৃতি শিকার হতে বাধ্য। এ জন্যই বলা যায়, পরিপূর্ণ মুসলমান হওয়া ছাড়া পরিপূর্ণ সংস্কৃতিবান হওয়া সম্ভব নয়। তাই হযরত মোহাম্মদ সা.-এর জীবনে ও বাণীতে, যে সংস্কৃতির প্রকাশ ঘটেছে তাই ইসলামী বা মুসলিম সংস্কৃতি বলে পরিচিত।

    নীরব ঘাতক সাংস্কৃতিক আগ্রাসন

    মুসলমানদের বিশ্বাস ও মূল্যবোধ বিনষ্ট করার লক্ষ্যে বাতিল শক্তি তার সাংস্কৃতিক কার্যক্রম পরিচালনা করে যাচ্ছে। তারা মনে করে দৃশ্যমান এ পৃথিবীর বাইরে আর কোনো জগৎ নেই, নেই কোনো জবাবদিহিতার অবকাশ। তাদের ভোগবাদী দৃষ্টির বিস্তার ঘটিয়ে মুসলমানদের চিরায়ত মূল্যবোধ বিনষ্ট করে দিচ্ছে তাদের সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। এর মাধ্যমে অন্যান্য মূল্যবোধের সাথে বিনষ্ট হচ্ছে:

    ১. আখেরাতের চেতনা। যে চেতনা মানুষকে পাপ ও অশ্লীলতা থেকে মুক্ত করে সমাজে পূত পবিত্রতার বিস্তার ঘটায়।

    ২. নেতৃত্বের চেতনা। যে চেতনা সামাজিক বিশৃঙ্খলা প্রতিরোধ করে সমাজে শান্তি-শৃঙ্খলা বজায় রাখে।

    ৩. তাওহিদের চেতনা। মানুষ একমাত্র আল্লাহর বান্দা এবং পরস্পর ভাই এ ধারণার বিলুপ্তি ঘটার ফলে সামাজিক ভারসাম্য বিনষ্ট হয়। এর ফলে ¯্রষ্টার শ্রেষ্ঠত্ব, মানুষের মর্যাদা, মানুষের প্রকৃত দায়িত্ব ও কর্তব্য এসব ধারণার অবলুপ্তি ঘটে এবং মানুষ পশুর স্তরে নেমে আসে। বস্তুত এর ফলে একজন মুসলমান তার ঈমানী চেতনা হারিয়ে ফেলে এবং সে এমন সব কাজ করতে থাকে যা একজন মুসলমান তার দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন না থাকার কারণে করে বসে। আর এ অবস্থা সৃষ্টি হলে মাথা গুনতিতে সে মুসলিম দলভুক্ত হলেও কুরআন ও হাদিসের দৃষ্টিতে সে আর মুসলিম থাকে না। সাংস্কৃতিক আগ্রাসন বা হামলার অন্যতম লক্ষ্য হচ্ছে মুসলমানদেরকে সত্যের পথ থেকে দূরে সরিয়ে রাখা। তার মধ্যে শয়তানি গুণ সৃষ্টি করা এবং জীবনকে ব্যর্থ করে দেয়া। যুগে যুগে মুসলমানরা বাতিলের যত রকম হামলার শিকার হচ্ছে তার মধ্যে এ সাংস্কৃতিক হামলাই সর্বাপেক্ষা মারাত্মক ও ক্ষতিকারক।

    সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের পরিণতি

    বাতিলের সর্বগ্রাসী সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের ফলে মুসলমানরা যে একটি মর্যাদাবান জাতি, তাদের রয়েছে আলাদা কৃষ্টি-কালচার, ইতিহাস-ঐতিহ্য, বিশ্ব মানবতার নেতৃত্বদানের জন্য এবং মহত্ত্ব ও মানবতার বিজয় ঘোষণার জন্য তাদের সৃষ্টি করা হয়েছে, এ কথা অধিকাংশ মুসলমান আজ বিস্মৃত। অপসংস্কৃতির সয়লাবে আজ মুসলমান দ্বিধা-বিভক্ত। পারস্পরিক দ্বন্দ্ব এবং অনৈক্য দিনদিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। আধুনিকতার নামে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে চলছে। শিক্ষার নামে কু-শিক্ষা, সংস্কৃতির নামে অপসংস্কৃতি বিনোদনের নামে বেহায়াপনা ও অশ্লীলতা এবং সর্বনাশা মাদক মুসলিম সমাজকে তিলে তিলে ধ্বংসের দিকে দিকে ধাবিত করছে। অন্যদিকে ধর্মীয় উন্মাদনার মাধ্যমে মুসলিমদের অভ্যন্তরীণ সম্পর্ককে পারস্পরিক কাদা ছুড়াছুড়িতে ব্যস্ত রেখেছে। যা বাতিলের তীক্ষè দূরদৃষ্টি দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে। বাতিলের সাংস্কৃতিক ঘুমপাড়ানি গান মুসলমানদের এতটা আচ্ছন্ন করে রেখেছে যে, তাদের ঘরজুড়ে দাউ দাউ আগুন দেখেও সে আগুন নেভাতে যে তাদের উঠে দাঁড়াতে হবে সে কথা বুঝতে পারছে না মুসলিম। এটাই মুসলমানের দুর্ভাগ্য। বাতিলের সাংস্কৃতিক হামলার কারণে প্রতিদিন হাজার হাজার মুসলিম তার মুসলমানিত্ব হারাচ্ছে মৃত্যু ঘটেছে তাদের ঈমানী চেতনার। দুনিয়ার আদম শুমারিতে তাদেরকে মুসলিম হিসাবে উল্লেখ করা হলেও আল্লাহর খাঁটি বান্দা হওয়ার সৌভাগ্য হারাচ্ছে তারা। হালাল হারামের কোন নিয়ম তাদেরকে পরিচালিত করতে পারে না। পাপ পুণ্যের ধার ধারে না বাস্তব কর্মজীবনে এ সকল মুসলমান। এ বিষয়ে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বারবার সতর্ক করে দিয়ে বলেছেন: “হে ঈমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণ মুসলমান না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না। অথচ সাংস্কৃতিক আগ্রাসনের শিকার ঈমানদারদের মৃত্যু ঘটে মুসলমানিত্বহীন অবস্থায়।

    সংস্কৃতি চর্চার গুরুত্ব

    আধুনিক বিশ্বে মুসলিম মিল্লাতের অনগ্রসর তার মূল কারণ ইমলামী সংস্কৃতির চর্চার অভাব। ইসলামের যে মূল দাবি মানুষের চিন্তা ও কর্মের সংস্কার ও পরিশুদ্ধি, সে সংস্কার ও পরিশুদ্ধি ছাড়া প্রকৃত অর্থে মুসলমান হওয়া যায় না, সংস্কৃতিবানও হওয়া যায় না। তাই সংস্কৃতিবান হতে হবে প্রথম মুসলিম হতে হবে আর মুসলিম হতে হলে সংস্কৃতিবান হতে হবে। কারণ সংস্কৃতির নিজস্ব কোনো আদর্শ নেই। সংস্কৃতি হচ্ছে জীবনের আচরিত কর্মপ্রবাহের নাম। ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো আদর্শের ভিত্তিতে এ কর্মধারা পরিচালিত হলে তা হবে সংকীর্ণ ও অসম্পূর্ণ। তাই ইসলামের প্রচার ও প্রসারের জন্য সংস্কৃতি চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। এক কথায় বলা যায়, ইসলাম প্রতিষ্ঠার জন্য ইসলামী সংস্কৃতির লালন ও চর্চা অপরিহার্য।

    ইসলামী সংস্কৃতির মূল ভিত্তি

    ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার মূল ভিত্তি হচ্ছে ঈমান। যে বিশ্বাস ও আচরণ ইসলাম একজন মানুষের জন্য বাধ্যতামূলক করে দিয়েছে তার সাথে সাংঘর্ষিত হতে পারে এমন কোন কিছুই ইসলামী সংস্কৃতির মধ্যে শামিল হতে পারে না। এ সীমারেখাকে অবহেলা করে বা কৌশলের নামে তাকে অবজ্ঞা করে যা করা হবে তা আর যাই হোক ইসলামী সংস্কৃতির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে না। প্রধানত তিনটি বিষয়ের ওপর ভিত্তি করে ইসলামী সংস্কৃতির প্রাসাদ নির্মিত হয়। বিষয়গুলো হচ্ছে: (১) তাওহিদ, (২) রিসালাত, (৩) আখেরাত ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার ভিত্তি হচ্ছে এ তাওহিদ, রিসালাত, আখেরাত। যে সকল কর্মকাণ্ড মানুষকে এ মৌলিক চেতনার স্মরণ থেকে ফিরিয়ে রাখে তাই অনৈসলামিক সংস্কৃতি, আর যে সব তৎপরতার মধ্য দিয়ে এ সকল চেতনা জাগ্রত, শাণিত ও মজবুত হয় তাই ইসলামী সংস্কৃতি।

    ১. তাওহিদ : তাওহিদ হচ্ছে ঈমানের বুনিয়াদ। আল্লাহ এক ও অদ্বিতীয় এটুকু বিশ্বাস করাই তাওহিদের জন্য যথেষ্ট হতে পারে না। রাসূলের জামানায় তৎকালীন আরব মুশরিক এবং কাফেররাও এটুকু বিশ্বাস করতো। তাওহিদের বিশ্বাসের অর্থ হচ্ছে আল্লাহই একমাত্র সর্বভৌম ক্ষমতার মালিক, তিনিই মানুষের রিজিকদাতা, পালনকর্তা এবং একমাত্র অভিভাবক। মানুষকে সৃষ্টি করেছেন তিনি তারই ইবাদতের জন্য আর দুনিয়ার সবকিছু সৃষ্টি করেছেন মানুষের জন্য। ভয় একমাত্র তাকেই করতে হবে সাহায্য চাইতে হবে তারই কাছে। মানুষের ভালো-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ সব তার হাতে। ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার মধ্য দিয়ে মানুষের মনে এ তাওহিদ বিশ্বাসকে দৃঢ় করতে হবে।

    ২. রিসালাত : মানবজাতির পথ প্রদর্শদনের জন্য আল্লাহ রাসূলকে সত্য দ্বীন ও হিদায়াতসহ পাঠিয়েছেন। ইসলামী সংস্কৃতির কাজ হলো মানুষের মনে রাসূলের নেতৃত্বের বিপরীত পৃথিবীর জন্য পাঠিয়েছেন। ইসলামী সংস্কৃতির কাজ হলো মানুষের মনে রাসূলের নেতৃত্বের বিপরীত পৃথিবীর জন্য কোনো নেতৃত্বের প্রতি যেন কারো মোহ সৃষ্টি না হয় মানুষের মনকে সেই উপলব্ধিতে উজ্জীবিত রাখা।

    ৩. আখিরাত : মানুষকে এ দুনিয়ায় আল্লাহ পাঠিয়েছেন তার ইবাদত করার জন্য। একদিন এ দুনিয়ার জিন্দেগি শেষ হয়ে যাবে। মানুষকে পুনরায় ফিরে যেতে হবে আল্লাহর দরবারে। যিনি আল্লাহর দেওয়া বিধান অনুযায়ী জীবন যাপন করবে না তার জন্য রয়েছে অনন্ত আজাব। জীবনের প্রতিটি কাজে মানুষকে তাই ভাবতে হবে যে কাজটি আমি করছি তা কি পরকালে আমার নাজাতের উসিলা হবে, নাকি তা আমার জন্য বয়ে আনবে জাহান্নামের কঠিন আজাব। ইসলামী সংস্কৃতির কাজ হচ্ছে মানুষের দিলকে সর্বদা আখিরাতমুখী করা। সংস্কৃতির বিভিন্ন তৎপরতার মধ্যে দিয়ে বারবার আখিরাতের কথা স্মরণ করিয়ে দিলেই কেবল একটি কল্যাণময় ইসলামী সমাজের আশা করা যেতে পারে।

    ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ, প্রচার, প্রসার ও

    লালন অপরিহার্য

    ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ এর প্রচার, প্রচার ও লালন করা ঈমানের দাবি। ঈমানের বিষয়ে কোন দুর্বলতা থাকলে যেমন পুরোপুরি ঈমানদার হওয়া যায় না। তেমনি ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ ও পালন না করে পুরোপুরি মুসলিম হওয়া যায় না। কারণ বিজাতীয় সাংস্কৃতির গোলামির শিকল একবার কোন জাতির গলায় আটকে গেলে তা ছিন্ন করা যেমন দুঃসাধ্য তেমনি ছিন্ন করতে না পারলে তার পরিণামও ভয়াবহ। তাই সাংস্কৃতিক বিকাশ ও লালনের জন্য করণীয় বিষয়গুলো আলোচনা করা হলো-

    (ক) পরিবার প্রথা : পরিবার মানব সভ্যতার মৌল ভিত্তি, সমাজের শান্তি-শৃংখলা, স্থিতিশীলতা, অগ্রগতি ইত্যাদি পারিবারিক সুস্থতা ও দৃঢ়তার ওপরই বহুলাংশে নির্ভরশীল। কিন্তু পাশ্চাত্যের দর্শন শিক্ষা ও অপসংস্কৃতি এই পরিবার প্রথার উপর আঘাত হেনে সভ্যতার মূল ভিত্তিকেই বির্পযস্ত করে তুলছে। তাই এ অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য ইসলাম পরিবারকে সংস্কৃতি চর্চার নিয়ামকে পরিণত করে অতুলনীয় বিশ্বব্যবস্থা গড়ে তুলছে তার কোনো বিকল্প নেই। পারিবারিক ক্ষেত্রে যদি আমরা ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ সাধন ও লালন করতে না পারি তাহলে পাশ্চাত্যের অবাধ ব্যক্তিস্বাধীনতা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছছে যে, সেখানকার নারী পুরুষ এখন “লিভটুগেদার সিস্টেমে” জীবন নির্বাহ করতেই ক্রমাগত অভ্যস্ত হচ্ছে। ফলে মানবিক মূল্যবোধের অবক্ষয় ঘটছে প্রতিনিয়ত। তাই এই প্রেক্ষিতে মানবসমাজে পরিবার প্রথা, পারিবারিক শিক্ষা, জীবন ধারার প্রচলন ও কল্যাণকর সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডল গড়ে তোলার জন্য এই পরিবারপদ্ধতি সব সময়ই অতিশয় কার্যকরী প্রমাণিত হয়েছে।

    (খ) মসজিদভিত্তিক সংস্কৃতি চর্চা : ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার দ্বিতীয় প্রাণকেন্দ্র হচ্ছে মসজিদ। মসজিদকে আমরা শুধুমাত্র নামাজের জন্য নির্ধারণ করে রেখেছি। অথচ রাসূলের সময় থেকে শুরু করে খোলাফায়ে রাশেদার যুগে মসজিদকে ইসলামী সংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্র হিসেবে ব্যবহার করা হতো। মসজিদ যেমন ইসলামী সমাজের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শিল্প চর্চার কেন্দ্রবিন্দু, তেমনি মসজিদ মুসলমানদের রাজনীতি ও সমাজব্যবস্থার কেন্দ্রভূমি। প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের মধ্য দিয়ে মুসলমানরা যে অভিন্ন সাংস্কৃতিক বোধে উজ্জীবিত হয় মুসলমানদের জীবনধারা যে বোধের দ্বারাই পরিচালিত হয়। আমাদের সমাজে মসজিদকে এখনো যথার্থ মর্যাদায় ব্যবহার করার মানসিকতা তৈরি হয়নি। এ মানসিকতায় পরিবর্তন ঘটাতে হবে। মসজিদকে ব্যবহার করতে হবে শিক্ষা, সংস্কৃতি ও শিল্পচর্চার কেন্দ্র রূপে। এ জন্য যথাযথ উদ্যোগ ও পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে।

    ১. ইসলামী সংস্কৃতির সুষ্ঠু আঞ্জামের জন্য মসজিদের ইমাম, মোয়াজ্জিনের বেতনভাতা বৃদ্ধি করে এ কাজে ফুলটাইম নিয়োজিত করতে হবে।

    ২. নিয়মিত কুরআন হাদিসের পাঠ ও আলোচনা করা।

    ৩. বিভিন্ন জাতীয় ও ইসলামী দিবসের ওপর আলোচনা করা।

    ৪. শিশু-কিশোর, যুবক ও বয়স্কদের জন্য পৃথক পাঠ ও প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা।

    ৫. বিশেষ বিশেষ সময় বা উপলক্ষে হামদ, নাত, ইসলামী সংগীত, দেশাত্মবোধক গান, আযান, কেরাত এর প্রশিক্ষণ ও প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা।

    ৬. পাঠাগার ও ভ্রাম্যমাণ পাঠাগার চালু করা এবং পাঠ প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা।

    ৭. মাঝে মাঝে বই, চিত্র ও শিল্পকলার প্রদর্শনীর ব্যবস্থা করা।

    ৮. প্রাথমিক স্বাস্থ্য সেবা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্র চালু করা।

    ৯. আত্মকল্যাণমূলক কাজের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।

    ১০. রমাদাান মাসকে সাংস্কৃতিক মাস হিসেবে উদযাপন করা।

    ১১. ইসলামী দিবসে বিশেষ প্রীতিভোজ, প্রীতি …… ব্যবস্থা করা।

    ১২. সামাজিক ও পারিবারিক বিভিন্ন সম্পদ পারস্পরিক দ্বন্দ্ব কলহ, মামলা-মোকদ্দমা ইত্যাদির মীমাংসা করা।

    ১৩. বাৎসরিক সম্মেলন ও তাফসির মাহফিলের ব্যবস্থা করা।

    ১৪. সংস্কৃতিতে অবদানের জন্য সনদ ও পুরস্কারের ব্যবস্থা করা।

    ১৫. নামাজ পড়া সহ প্রতিটি কর্মকাণ্ডে মহিলাদের সম্পৃক্ত করার জন্য আলাদা ব্যবস্থা করা।

    ১৬. বয়স্কদের জন্য নৈশ পাঠ/ নৈশ বিদ্যালয়ের ব্যবস্থা করা।

    ১৭. ভ্রাম্যমাণ লাইব্রেরি বা ব্যক্তির দ্বারা প্রতিদিন বাড়ি/বাসায় বই সরবরাহের ব্যবস্থা করা।

    ১৮. সকল কার্যক্রমের ওপর ভিত্তি করে বাৎসরিক প্রতিবেদন প্রকাশ করা।

    এভাবে উপরোক্ত কর্মসূচির মাধ্যমে শিশু, কিশোর, যুবক ও বয়স্কদেরকে ব্যাপকভাবে মসজিদমুখী করার উদ্যোগ নিতে হবে। মসজিদ কেবল নামাজ পড়ার জায়গা হিসেবে নয়, সাংস্কৃতিক কেন্দ্র হিসেবে মানুষের অবসর, সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ও বিনোদনের কেন্দ্র রূপেও মসজিদকে গড়ে তুলতে পারলে ইসলামী সংস্কৃতি বিকশিত হবে।

    (গ) সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠানকে সক্রিয় করে তোলা: আমাদের দেশের সরকারি ও বেসরকারি সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান রয়েছে সেগুলোকে অধিকতর সক্রিয় করে তুলতে হবে। বাংলা একাডেমি, শিল্পকলা একাডেমি, শিশু একাডেমি, নজরুল ইনস্টিটিউট, ইসলামিক ফাউন্ডেশনসহ সাংস্কৃতিক মন্ত্রালয়ের অর্থানুকূল্যে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর তৎপরতা অব্যশই এ দেশের অধিকাংশ জনগণের বিশ্বাস ও চেতনার সপক্ষে পরিচালিত হওয়া প্রয়োজন। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্যি যে এসব প্রতিষ্ঠান ভিনদেশী সংস্কৃতি নিয়ে যতটা সক্রিয় ইসলামী সংস্কৃতি বিষয়ে ততটা উদাসীন। জনগণের অর্থানুকূল্যে পরিচালিত এসব প্রতিষ্ঠানকে জনকল্যাণমুখী ও ইসলামী সাংস্কৃতিক বিষয়কে লালন করার জন্য ভূমিকা পালন করতে হবে।

    (ঘ) মিডিয়ার ভূমিকা পালন : ইসলামী সংস্কৃতি বিকাশের জন্য মিডিয়া একটি শক্তিশালী গণমাধ্যম। ইলেকট্রনিক এবং প্রিন্ট মিডিয়া ছাড়া সংস্কৃতি বিকশিত হওয়া সম্ভব নয়। সরকারি মিডিয়া বিশেষ করে রেডিও, টিভি, পত্র-পত্রিকার পাশাপাশি বেসরকারি মিডিয়া গড়ে তুলতে হবে। আধুনিক বিশ্বে মিডিয়া সুবাদে অপসংস্কৃতি যে ভাবে মুসলমানদের ঈমান আকিদাকে ধ্বংস করছে তার মোকাবেলায় ইসলামী অনুষ্ঠান মানা অর্থাৎ সংস্কৃতি বিকাশের লক্ষ্যে বেসরকারি চ্যানেলের কোনো বিকল্প নেই।

    (ঙ) চলচ্চিত্র নির্মাণ : চলচ্চিত্র দেশের একটি উল্লেখযোগ্য গণমাধ্যম। এ মাধ্যমটি বর্তমানে এতটা অশ্লীলতা ও বেহায়াপনায় ভরপুর যার নাম শুনলে মানুষ মনে করে ইসলামে আবার সিনেমা তা কি করে সম্ভব। ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে বলা যায়, সিনেমা বা ফিল্মে মূলত ও স্বতঃই কোনো দোষ বা খারাবি নেই। তা কি কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে, তা নিয়ে কি উদ্দেশ্য সাধন করতে চাওয়া হচ্ছে সেটাই আসল প্রশ্ন। এ কারণে কতিপয় শর্তসমূহ সহকারে কাজে লাগালে তা খুবই ভালো, উত্তম ও কল্যাণকর হতে পারে।

    ১. শিরক থাকতে পারবে না।

    ২. নগ্নতা ও অশ্লীলতা থাকতে পারবে না।

    ৩. শিক্ষামূলক ও জ্ঞানমূলক হতে হবে।

    ৪. দেশ ও জাতি বিদ্বেষী হতে পারবে না।

    ৫. মৌলিক উভয় ক্ষেত্রে (অভিনয় ও দর্শক) নারী ও পুরুষের অবাধ মেলামেশা করা যাবে না।

    উপরোক্ত শর্তের আলোকে সিনেমা নির্মাণ করা হলে সংস্কৃতি ও ইসলামের বাণী পৌঁছানোর জন্য চলচ্চিত্রের মাধ্যমটি অধিক ফলপ্রসূ হবে। তাই ইসলামী দৃষ্টিভঙ্গিতে ছবি নির্মাণের জন্য প্রযোজক, পরিচালক, শিল্পী ও কলাকুশলীদের প্রশিক্ষণ ও পৃষ্ঠপোষকতার জন্য ব্যবসায়িক মনোভাব ও ইসলামের স্বার্থে মুসলিম ব্যবসায়ীদেরকে এগিয়ে আসতে হবে। এখানে উদ্যোক্তা তৈরির জন্য ইসলামী ব্যাংক, বীমা, আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিনিয়োগ প্রধানে এগিয়ে আসলে এ খাত দ্রুত বিকশিত হবে। এবং নতুন নতুন উদ্যোক্তা তৈরি হবে। ফলে দ্বীনের প্রচার ও প্রসারের কাজ অধিকতর বেগবান হবে।

    (চ) নাটক তৈরি করা : নাটক আরেকটি জনপ্রিয় গণমাধ্যম। নাটকের মাধ্যমেও সংস্কৃতি জনপ্রিয় করা সম্ভব। প্রধানত উচ্চমধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্তরা এর দর্শক। সমাজ পরিবর্তনের মুখ্য নিয়ামক শক্তি মধ্যবিত্ত সমাজ, তাদের মানসিক পরিবর্তনের জন্য নাটক খুবই জরুরি, এ জন্য ইসলামী সমাজ নির্মাণের স্বপ্নে যারা বিভোর নাটকের বিষয়টিও তাদের গুরুত্বসহ বিবেচনা করতে হবে। তাই ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশে নাটক রচনা ও সঞ্চায়নের ব্যাপারেও তাদের উদ্যোগী ভূমিকা গ্রহণ করতে হবে।

    (ছ) সঙ্গীতচর্চা : মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক বোধ জাগাতে ও সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সঙ্গীতের ভূমিকা তাই অনস্বীকার্য। হাম্দ, নাত, দেশাত্মবোধক ও ইসলামী সঙ্গীতের বিভিন্ন অনুষ্ঠান এবং অডিও, ভিডিও, সিডি, ক্যাসেট এ ক্ষেত্রে ফলপ্রসূ ভূমিকা পালন করে। তাই যারা ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের কাজে নিয়োজিত ইসলামী সঙ্গীতের প্রসারেও তাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

    (জ) চারু ও কারুকলার বিস্তার : মানুষ স্বভাবতই সৌন্দর্যপ্রিয়। মানুষের এই শিল্প চেতনা যেন কল্যাণের পথে অগ্রসর হয় সে জন্যই ইসলামী চারু ও কারুকলার বিস্তার ঘটানো প্রয়োজন। একজন মানুষের ঘরে প্রবেশ করলে বুঝা যায় লোকটি কোন প্রকৃতির। কেউ বা মূর্তি দিয়ে, আবার কেউবা সাজায় ফুল শোভায় বা ক্যালিগ্রাফিতে। এ জন্য চারু ও কারুকলা শিল্পে ইসলামের ছোঁয়া থাকলে মানুষ অশ্লীলতা থেকে এবং এমনকি প্রচ্ছন্ন শিরক থেকে রক্ষা পেতে পারে। সামাজিকভাবে ইসলামী আবহ সৃষ্টির জন্য। তাই চারু ও কারু শিল্পের ব্যাপক চর্চা হওয়া প্রয়োজন।

    (ঝ) সাহিত্য রচনা করা : আধুনিক বিশ্বে মানুষের মধ্যে সাংস্কৃতিক বোধ সৃষ্টিতে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে যে মাধ্যমটি তা হচ্ছে সাহিত্য, গল্প, কবিতা, উপন্যাস, নাটক, প্রবন্ধ, ছড়া, এসব নান রকম ফর্মে সাহিত্যচর্চা চলে। শিক্ষিত মানুষ মাত্রই সাহিত্যের কোনো না কোনো ফর্মের প্রতি আগ্রহ পোষণ করবে এবং সাহিত্য পড়বে এটাই স্বাভাবিক। এভাবে পড়ার মাধ্যমে অর্জিত জ্ঞান দ্বারাই তার জীবনবোধ গড়ে ওঠে। ফলে ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ ঘটাতে হলে ইসলামী সাহিত্যের ব্যাপক প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা করতে হবে। ইসলামী সাহিত্যের চাহিদা যত বাড়বে ইসলামী সাহিত্য সৃষ্টিতে লেখকরা ততবেশি আগ্রহী ও সচেষ্ট হবে। তাই আমাদের মাসিক বাজেটে চাল-ডালের মত বই ক্রয়েরও একটি পরিকল্পনা করা সকলের নৈতিক দায়িত্ব। কারণ চাল-ডাল আমাদের দেহের ক্ষুধা মেটায় আর বই মেটায় আমাদের মনের ক্ষুধা।

    (ঞ) গান ও বাদ্যযন্ত্র : যে কাজে সাধারণত মানুষের মন আকৃষ্ট হয় ও অন্তর পরিতৃপ্তি ও প্রশান্তি লাভ করে এবং কর্ণকুহরে মধু বর্ষিত হয় তা হচ্ছে। নির্লজ্জতা, কুৎসিত-অশ্লীল ভাষা কিংবা পাপ কাজে উৎসাহ উত্তেজনা দানের সংমিশ্রণ না থাকলে তা মুবাহ্। উপরন্তু যৌন আবেগ উত্তেজনাকর বাদ্য সংমিশ্রণ না হলে সেই সাথে বাদ্যযন্ত্র ব্যবহারেরও কোন দোষ নেই। এ জন্য শরিয়তের দৃষ্টিতে কতিপয় শর্ত অপরিহার্য।

    ১. গানের কথা শিরকমুক্ত হতে হবে।

    ২. নগ্নতা ও অশ্লীলতা থাকতে পারবে না।

    ৩. যৌন আবেগ ও উত্তেজনাকর বাদ্য সংমিশ্রণ থাকতে পারবে না।

    ৪. শিক্ষা ও গঠনমূলক হতে হবে।

    ৫. গান ও বাদ্য মানুষের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশে সহায়ক হতে হবে।

    উল্লিখিত শর্তসাপেক্ষে আনন্দ উৎসবের ক্ষেত্রে খুশি ও সন্তোষ প্রকাশের জন্য এসব জিনিস শুধু জায়েজই নয়, পছন্দনীয়ও বটে। যেমন: ঈদ, বিয়ে, শুভসংবাদ, ওয়ালিমা, ইসলামী বিশেষ দিবস উদযাপন, আকিকা অনুষ্ঠান ও সন্তান জন্ম হওয়া কালে এসব ব্যবহার করা যেতে পারে দ্বিধাহীনচিত্তে। হযরত আয়িশা রা. বলেছেন, আনসার বংশের এক ব্যক্তির সাথে একটি মেয়ের বিয়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছিল। তখন নবী করীম সা. বললেন: হে আয়িশা! ওদের সঙ্গে আনন্দ ফুর্তির ব্যবস্থা কিছু নেই? কেননা আনসাররা তো এগুলো বেশ পছন্দ করে। (বুখারি) তাই ইসলামী সংস্কৃতির বাহন হিসেবে গান ও বাদ্যযন্ত্রকে সার্বজনীন করার জন্য ইসলামী সমাজ বিনির্মাণের কাজে যারা নিয়োজিত তাদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে।

    (ট) ক্রীড়া, আনন্দ ও প্রতিযোগিতা : ইসলাম বাস্তববাদী জীবনবিধান। তা মানুষকে অবাস্তব কল্পনা বিলাস ও নানা চিন্তা ভাবনার কুঞ্ঝটিকার পরিবেষ্টনে আবদ্ধ করে রাখতে ইচ্ছুক নয়। বরং এ বাস্তবতার পৃথিবীতে ঘটনাপ্রবাহের আবর্তনের মধ্যে সুষ্ঠু রূপে বসবাস করার রীতি ও পদ্ধতিই ইসলাম মানুষকে শিক্ষা দেয়। তা মানুষকে নভোমণ্ডলে বিচরণকারী ফেরেশতা মনে করে কর্মবিধান তৈরি করেনি। খাদ্য-পানীয় গ্রহণকারী ও হাটে বাজারে বিচরণকারী মানুষ মনে করেই তার জন্য বিধান দেওয়া হয়েছে। ইসলাম মানুষকে প্রকৃতি ও স্বভাবগত ভাবধারার উপর পুরো মাত্রায় লক্ষ্য নিবদ্ধ রেখেছে। আল্লাহ তায়ালা মানুষকে সৃষ্টি করেছেন এভাবে যে, পানাহার যেমন তার প্রকৃতির চাহিদা তেমনি আনন্দ-স্ফূর্তি ও সন্তুষ্টি-উৎফুল্লচিত্ত হয়ে থাকা এবং হাসি-তামাশা-খেলা ইত্যাদিও তার প্রকৃতিগত ভাবধারা হয়ে রয়েছে। এ সত্য কোনোক্রমেই অস্বীকার করা যায় না। আনন্দ-স্ফূর্তি ও ক্রীড়ার বহু প্রকার ধরন ও পদ্ধতি এমন রয়েছে যা নবী করীম সা. মুসলমানদের জন্য জায়েজ করেছেন। মুসলমানরা এ গুলোর সাহায্যে মনের বোঝা হালকা করতে পারে, স্ফূর্তি লাভ করতে পারে। এসব ক্রীড়া মানুষকে ইবাদত ও কর্তব্য পালনে- এসব কাজে তৎপরতা সহকারে অংশ গ্রহণে উদ্বুদ্ধ করে। এসব শরীর চর্চামূলক ক্রীড়ার সাহায্যে শক্তিবর্ধক ট্রেনিং লাভ করতে পারে। তার দরুন মানুষ জিহাদে অংশগ্রহণের জন্যও প্রস্তুত হতে পারে। খেলাধুলা বিষয়ে শরিয়তের কতিপয় শর্ত রয়েছে তা নিম্নে তুলে ধরা হলো:

    ১. খেলাধুলার কারণে নামাজ থেকে বিরত হওয়া বা বিলম্ব করা যাবে না।

    ২. তাতে জুয়া মদ্যপান ও অশ্লীলতা থাকতে পারবে না।

    ৩. খেলার সময় খেলোয়াড় ও দর্শক নিজেদের মুখকে গালাগাল, কুৎসিত-অশ্লীল কথাবার্তা থেকে মুক্ত ও পবিত্র রাখবে।

    ৪. পোশাক পরিচ্ছদ শালীন ও শরিয়াহ্ সীমারেখার মধ্যে হতে হবে।

    ৫. খেলাকে কেন্দ্র করে ঝগড়া-বিবাদ, অশ্লীল নৃত্য ও দেহের বিশেষ অঙ্গভঙ্গি প্রকাশ করা যাবে না।

    ৬. পুরুষ ও মহিলা একত্রে খেলা করা যাবে না।

    ৭. খেলা শরীর চর্চামূলক, গঠনমূলক, শিক্ষামূলক ও বিনোদনমূলক হতে হবে।

    সুতরাং উল্লিখিত শর্ত পরিপালন করে খেলাধুলা করতে বিধিনিষেধ নেই। তবে এসব শর্ত লংঘিত হলে কিংবা তার অংশবিশেষও ভঙ্গ করা হলে সে খেলা হারাম হয়ে যাবে যা কাম্য হওয়া উচিত নয়।

    (ঠ) সাংস্কৃতিক কর্মী/শিল্পীদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান : ইসলামী সংস্কৃতির গুরুত্ব এত বেশি যে, ইসলামী বিপ্লবের জন্য সাংস্কৃতিক বিপ্লব অপরিহার্য। কোনো জনপদে যদি কখনও জনমতের কারণে ইসলাম বিজয় লাভ করে আর সেখানে যদি পূর্ব থেকে সাংস্কৃতিক চর্চা না থাকে তবে সে জনপদে ইসলাম বিজয়ী হিসেবে বেশিদিন টেকসই হবে না। কারণ সংস্কৃতি মানুষের মনের লালিত স্বপ্নকে বিকশিত করে। আর বিকশিত যখন সঠিকভাবে হবে না তখন মানুষ পথভ্রষ্ট হয়ে বিপথে ধাবিত হবে। এজন্য কবি সাহিত্যিক ও শিল্পীরা হচ্ছেন সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কারিগর। তারা হচ্ছেন সমাজদেহের চক্ষু এবং সভ্যতার বাগান। আর সমাজ পরিচালকরা হচ্ছেন সে বাগানের মালী। তারা যত বেশি এ বাগানের পরিচর্যা করবে সমাজে তত বেশি হৃদয়ের পুষ্প ফুটবে। যে জনগোষ্ঠী এ বাগানের পরিচর্যায় অমনোযোগী হবে তারা বঞ্চিত হবে মানবতার পুষ্প সৌরভ থেকে। সে একটি কল্যাণকর ইসলামী সমাজ যাদের কাম্য তাদের উচিত কবি, সাহিত্যিক, শিল্পীদের উপযুক্ত পৃষ্ঠপোষকতা দান করা। এ পৃষ্ঠ-পোষকতা তারা যতবেশি দিতে পারবে ততই বৈচিত্র্যের বিকাশ ঘটবে। তাই শিল্পীদের সার্বিক সহায়তা দানের জন্য ব্যাপকভিত্তিক কিছু সৃস্পষ্ট ও সুষম পরিকল্পনা দরকার যা নি¤েœ আলোচনা করা হলো:

    ১. ইসলামী সংগঠনের উচিত তাদের পরিকল্পনায় সাংস্কৃতিক বিষয়কে অগ্রাধিকার দেওয়া।

    ২. সাংগঠনিক সকল কার্যক্রমে বেশি বেশি সাংস্কৃতিক চর্চা করা।

    ৩. সাংস্কৃতিক বিষয়ে জনমত সৃষ্টি করা।

    ৪. সাংগঠনিক প্রতিটি স্তরে পৃথক সাংস্কৃতিক বিভাগ চালু করা।

    ৫. সাংস্কৃতিক বিভাগের জন্য পর্যাপ্ত অর্থ বরাদ্দ করা।

    ৬. অসহায় শিল্পীদের আর্থিক সহায়তা অব্যাহত রাখা।

    ৭. তাদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও অবকাঠামোগত সুযোগ-সুবিধার ব্যবস্থা করা।

    ৮. সাংস্কৃতিক চর্চা ও গবেষণার জন্য উপযুক্ত পরিবেশের ব্যবস্থা করা।

    ৯. বছরে একবার সারা দেশের সাংস্কৃতিমনা শিল্পীদের নিয়ে সম্মিলন বা পারস্পরিক মত বিনিময়ের ব্যবস্থা করা।

    ১০. বছরের শুরুতে এ খাতের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ ও নিয়মিত প্রতিবেদন প্রকাশ করা।

    ১১. এ খাতে বাণিজ্যিক ভিত্তিতে এগিয়ে আসার জন্য ব্যবসায়ীদের উদ্বুদ্ধ করণ ও আগ্রহ সৃষ্টি করা।

    ১২. এ খাতকে বাণিজ্যিক রূপ দেওয়ার জন্য জনমত গঠন এবং প্রচার ও প্রসারের ব্যবস্থা করা।

    পৃথিবীর প্রতিটি মানস পরিবর্তনে এ সত্যটি বারবার প্রমাণিত হয়েছে যে, মুখ্যত পরিবর্তন ঘটিয়েছে রাজনৈতিক নেতৃত্ব কিন্তু তার পরিবেশ সৃষ্টি করেছে সংস্কৃতি কর্মীরা। সাংস্কৃতিক কর্মীরা হচ্ছে যুগের মুয়াজ্জিন আর রাজনৈতিক নেতা হচ্ছেন ইমাম। তাই আধুনিক যুগে ইসলামী বিপ্লব সাধনের জন্য যতক্ষণ পর্যন্ত সাংস্কৃতিক কর্মীদের ময়দানে নামাতে না পারবে ততক্ষণ পর্যন্ত লাব্বাইক লাব্বাইক বলে ঘর থেকে ছুটে আসবে না জনগণ। জনগণ কাতারবন্দী হয়ে দাঁড়াবে না কোনো নেতার পিছনে ইসলামী বিপ্লব সাধনের জন্য এ জন্যই সাংস্কৃতিক কর্মীদের যথাযথ পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান করে ব্যাপকভাবে ইসলামী বিপ্লবের উপযোগী পরিবেশ ও জনমত সৃষ্টির জন্য ময়দানে নামানো আজ সময়ের দাবি।

    সাংস্কৃতিক বিষয়টি মুসলমানদের জীবনের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, এ জন্য প্রতিটি সচেতন মুসলমানের উচিত নিয়মিত সাংস্কৃতিক তৎপরতা বৃদ্ধি ব্যাপারে উৎসাহী ভূমিকা পালন করা। এ ভূমিকা অব্যাহত না থাকলে অপসংস্কৃতি ইসলামী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করবে। এ ধ্বংস মুসলমান তো দূরের কথা ইসলামী আন্দোলনের অনেক নেতাও কর্মীর কাছে সুস্পষ্ট নয়। তাই এ জন্য ইসলামী আন্দোলনে সংস্কৃতির চর্চা ও পৃষ্ঠপোষকতা না করলে তা জাতির জন্য ভয়াবহ বিপর্যয় ও ক্ষতি ডেকে আনবে। এই ভয়াবহ ক্ষতির থেকে মুক্তির জন্য ইসলামী সংস্কৃতির বিকাশ, প্রচার, প্রসার করা সময় ও ঈমানের দাবি।

    লেখক : কলামিস্ট ও ব্যাংকার

    রফিকুল ইসলাম