ট্যাগ প্রতারণা

  • সাইবার স্পেসে টার্গেটে বয়স্ক ও গৃহিণীরা

    ডেক্স নিউজ : দেশের সাইবার স্পেসে নানাভাবে প্রতারণার শিকার হচ্ছেন বয়স্ক মানুষ ও গৃহিণীরা। মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন বিনিয়োগ, ভুয়া বিজ্ঞাপন এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তারা টার্গেটে পড়ছেন। এ ধরনের ঘটনায় থানায় দায়ের করা অন্তত ১৫টি মামলার নথি পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়সূত্র ও পত্রিকায় বিজ্ঞাপনে চাকরির প্রলোভন, ভুয়া লটারির প্রলোভন, বিদেশ থেকে অনলাইনে লোভনীয় দামে পণ্য উপহার পাঠানোসহ মোবাইল ব্যাংকিংয়ে পিন হাতিয়ে নেওয়ার মাধ্যমে ভুক্তভোগীদের সর্বস্বান্ত করা হচ্ছে।

    তদন্তসংশ্লিষ্টরা বলছেন, গৃহিণী ও বয়স্ক ছাড়াও নানা শ্রেণি-পেশার মানুষ সাইবার প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। তদন্তে উঠে এসেছে, প্রযুক্তি ব্যবহারে সীমিত দক্ষতা, আর্থিক সিদ্ধান্তে স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত গ্রহণে সামর্থ্যবান না হওয়া এবং অনলাইন নিরাপত্তা সম্পর্কে অজ্ঞতাকে পুঁজি করে চক্রটি গৃহিণী ও বয়স্কদের ক্ষতি করছে।ঘটনা ১ : ময়মনসিংহের কোতোয়ালি এলাকার আসমিনা খাতুন (৩৪) পেশায় গৃহিণী। বর্তমানে ঢাকার মিরপুর এলাকায় থাকেন। সাইবার প্রতারণার এক জটিল ফাঁদে পড়ে তিনি হারিয়েছেন ১১ লাখ টাকা। গত ৯ ডিসেম্বর বিকালে হোয়াটসঅ্যাপে একটি বিদেশি নম্বর থেকে তার কাছে অনলাইনে কাজের প্রস্তাব আসে। বিভিন্ন প্রলোভনে রাজি করিয়ে তাকে একটি টেলিগ্রাম গ্রুপে যুক্ত করা হয়। ‘রিসেপশনিস্ট’ পরিচয়ে এক ব্যক্তি ধাপে ধাপে তাকে টাকা বিনিয়োগে উদ্বুদ্ধ করেন। এরপর ১০ থেকে ২২ ডিসেম্বর পর্যন্ত বিভিন্ন সময়ে বিকাশ ও ব্যাংক অ্যাকাউন্টে প্রায় ১১ লাখ টাকা তুলে দেন তিনি। প্রতিবারই তাকে আশ্বাস দেওয়া হয়, নির্দিষ্ট অঙ্ক জমা দিলেই লাভসহ টাকা ফেরত পাওয়া যাবে। একপর্যায়ে আরও টাকা দাবি করলে সন্দেহ সৃষ্টি হয় আসমিনার। পরে টাকা ফেরত পেতে চেষ্টা করেন। না পেয়ে থানায় মামলা করেন।গৃহিণী আসমিনা খাতুন জানান, পরিবারের পাশাপাশি বাবার বাড়ির আর্থিক দৈন্য দূর করতে অনলাইন ফ্ল্যাটফর্মে কাজটি শুরু করেছিলেন। বিজ্ঞাপনে ক্লিক করার পর প্রতারকরা তাকে হোয়াটসঅ্যাপে যুক্ত করে এবং প্রথমে ‘রেটিং টাস্ক’ দিয়ে ৩০০ টাকা প্রদান করে। পরে টেলিগ্রাম গ্রুপে নিয়ে ৮০০ টাকা বিনিয়োগে ১,০৪০ টাকা ফেরত দেয়। এতে তার বিশ্বাস তৈরি হয়। পরে ধাপে ধাপে ৩,০০০ ও ১২,০০০ টাকা বিনিয়োগ করেন। এরপর আরও বেশি লাভের প্রলোভন দেখানো হয়। গ্রুপের অন্য সদস্যদের কথায় আশ্বস্ত হয়ে তিনি স্বামীকে না বলে টাকা দেন। আত্মীয়দের কাছ থেকেও ধার নেন। ১২,০০০ টাকা দেওয়ার পর প্রতারকরা আরও ৩০,০০০ টাকা দাবি করে। এতে সন্দেহ হয়। কিন্তু আগের টাকা ফেরত পাওয়ার আশায় পরে চক্রের চাওয়া অর্থ দিতে গিয়ে তিনি শেষ পর্যন্ত ১১ লাখ টাকা হারান। ঘটনা-২ : ঢাকার মিরপুরের বাসিন্দা ৭৭ বছর বয়সি খন্দকার কামরুজ্জামান বাংলাদেশ পুলিশের অবসরপ্রাপ্ত সদস্য। কিস্তিতে গাড়ি কেনার প্রলোভনে পড়ে তিনি হারিয়েছেন ২ লাখ ৮০ হাজার টাকা। গত বছরের ৫ ডিসেম্বর একটি জাতীয় দৈনিকে প্রকাশিত বিজ্ঞাপন দেখে একটি নম্বরে যোগাযোগ করেন তিনি। প্রতারকরা গাড়ি

    সরবরাহের আশ্বাস দিয়ে অগ্রিম, রেজিস্ট্রেশন ও ডেলিভারি খরচের খাত দেখিয়ে ধাপে ধাপে টাকা নেয়। ৬ থেকে ৮ ডিসেম্বরের মধ্যে একাধিক নগদ নম্বরে তিনি অর্থ পাঠান। পরে গাড়ি না পেয়ে এবং প্রতারকদের সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। বিষয়টি বুঝতে পেরে থানায় অভিযোগ করেন। কেন ঝুঁকিতে বয়স্ক ও গৃহিণীরা : মামলা ও তদন্তের ফলাফল বিশ্লেষণে দেখা গেছে, নির্দিষ্ট কিছু কারণে এই শ্রেণির মানুষ বেশি প্রতারিত হচ্ছেন। অনেক বয়স্ক মানুষ স্মার্টফোন ব্যবহার করলেও নিরাপত্তাবিষয়ক সেটিংস, ফিশিং লিংক বা ভুয়া ওয়েবসাইট চিহ্নিত করতে পারেন না। একই অবস্থা গৃহিণীদের ক্ষেত্রেও দেখা যায়। এছাড়া লোভনীয় বিজ্ঞাপনের মাধ্যমে ‘লটারিতে জিতেছেন’, ‘বিদেশ থেকে উপহার এসেছে’, ‘ব্যাংক অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে’-এ ধরনের বার্তায় গৃহিণী ও বয়স্করা প্রযুক্তিগত যাচাই-বাছাই করার সুযোগ তাদের হাতে থাকে না। ফলে ফাঁদে পড়ছেন।প্রতারকদের কৌশল: প্রতারকরা খুব পরিকল্পিতভাবে তাদের টার্গেটের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করে। প্রথমে তারা পরিচয় দেয় বিশ্বাসযোগ্য কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি হিসাবে। এর মধ্যে রয়েছে-ব্যাংক কর্মকর্তা, মোবাইল কোম্পানির কর্মী বা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্য পরিচয়। এরপর ফোনে বা এসএমএসে তারা ভুক্তভোগীর আংশিক ব্যক্তিগত তথ্য জানিয়ে বিশ্বাস তৈরি করে। এরপর দ্রুত সিদ্ধান্ত না নিলে অ্যাকাউন্ট বন্ধ হয়ে যাবে বা বড় ধরনের ক্ষতি হবে-এমন ভয় দেখানো হয়। এতে ভুক্তভোগীরা চিন্তা না করেই ফোনের ওটিপি বা টাকা দিয়ে দিচ্ছেন। এছাড়া ‘ঘরে বসে ইনকাম’, অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বন্ধুত্ব, পরে প্রেমের অভিনয় করে ধীরে ধীরে অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনাও ঘটছে।প্রতারিত হলে যেখানে অভিযোগ করবেন: আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা বলছেন, প্রযুক্তির সঙ্গে তাল মিলিয়ে প্রতারকরাও তাদের কৌশল বদলাচ্ছে। তাই সচেতনতা ছাড়া এই সমস্যা মোকাবিলা করা কঠিন। বিশেষ করে বয়স্ক ও গৃহিণীদের সচেতনতা প্রয়োজন। এছাড়া সাইবার প্রতারণার শিকার হলে দ্রুত নিকটস্থ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) বা মামলা করতে হবে। এছাড়া পুলিশের সাইবার ক্রাইম ইউনিটের হটলাইন নম্বর ০১৩২০০১০১৪৬-৪৮-এ অথবা সাইবার পুলিশের বেরিফাইড ফেসবুক পেইজ ‘Cyber Police Centre, CID, Bangladesh police’ অভিযোগ দিতে পারেন ভুক্তভোগীরা। সিআইডির বিশেষ পুলিশ সুপার জসিম উদ্দিন খান যুগান্তরকে বলেন, কোনো অবস্থাতেই ফোন বা মেসেজে ব্যক্তিগত তথ্য, পিন নম্বর বা ওটিপি শেয়ার করা যাবে না। সন্দেহজনক লিংক এড়িয়ে চলতে হবে। এছাড়া লোভনীয় কোনো অফার দেখলে পরিবারের প্রযুক্তি জ্ঞানসম্পন্ন সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করারও পরামর্শ দেন তিনি।

    M