শিক্ষা ডেস্ক:
যশোরের চৌগাছা সরকারি শাহাদৎ পাইলট মডেল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। সাধারণ ও বিএম শাখা মিলিয়ে উপজেলার অন্যতম বড় এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটি দীর্ঘদিন ধরে প্রধান শিক্ষক ছাড়াই চলছে। এরই মধ্যে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকও গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়ায় শিক্ষা কার্যক্রম ও প্রশাসনিক কাজে দেখা দিয়েছে নানা জটিলতা।
১৯২৯ সালে প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী এ বিদ্যালয়টি পরে এমপিওভুক্ত হয়। চৌগাছা শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত বিদ্যালয়টি ২০১৮ সালে সরকারিকরণ করা হয়। সর্বশেষ প্রধান শিক্ষক আজিজুর রহমান ২০২৪ সালের ২৮ নভেম্বর অবসরে যাওয়ার পর থেকে পদটি শূন্য রয়েছে।
এর আগে ২০১৮ সালে সড়ক দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলাম। এরপর থেকে তিনি আর নিয়মিত বিদ্যালয়ে ফিরতে পারেননি। বর্তমানে তিনি অর্ধেক বেতনে ছুটিতে রয়েছেন।
চলতি বছরের ৪ জানুয়ারি জ্যেষ্ঠতার ভিত্তিতে বিদ্যালয়ের সিনিয়র শিক্ষক সাইদুল ইসলাম বাবুকে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তবে তিনিও গুরুতর অসুস্থ। নিজের খরচে একজন খণ্ডকালীন শিক্ষক রেখে কোনোভাবে পাঠদান কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। সম্প্রতি তিনি চোখের দৃষ্টিশক্তি হারিয়েছেন। ফলে চলাফেরা থেকে শুরু করে দাপ্তরিক কাজেও অন্য শিক্ষকদের সহযোগিতা নিতে হচ্ছে তাঁকে।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের দাবি, প্রধান শিক্ষকসহ তিনটি শিক্ষক পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য। সরকারিকরণের পর এনটিআরসিএর মাধ্যমে শিক্ষক নিয়োগের সুযোগ নেই। অন্যদিকে সরকার থেকেও নতুন শিক্ষক দেওয়া হচ্ছে না। পাশাপাশি অফিস সহকারী ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীর পদও শূন্য রয়েছে। এতে বিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে।
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর বিদ্যালয়ে সকালের সমাবেশে উপস্থিত ছিল দেড় শতাধিক শিক্ষার্থী। একই সঙ্গে বিদ্যালয়ে নিয়মিত শৃঙ্খলা ও তদারকির ঘাটতিও চোখে পড়ে।
সপ্তম শ্রেণির এক শিক্ষার্থীর অভিভাবক সাংবাদিক আসাদুজ্জামান ও প্রভাষক আজিজুর রহমান বলেন, বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা অনেকটাই ভেঙে পড়েছে। নির্ধারিত সময়ে ক্লাস শুরু হলেও অনেক শিক্ষার্থী ইচ্ছেমতো বিদ্যালয় ত্যাগ করে। ইউনিফর্ম পরা অবস্থায় তারা দিনের বাকি সময় বিভিন্ন বিনোদনকেন্দ্র, হোটেল ও রেস্তোরাঁয় কাটায়। প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে নিয়মিত ক্লাসও হচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তারা।
বিদ্যালয়ে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে দ্রুত একজন প্রধান শিক্ষক নিয়োগের দাবি জানান তারা।
এ বিষয়ে প্রেসক্লাব চৌগাছার সভাপতি অধ্যক্ষ আবু জাফর, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক বাবুল আক্তার এবং বিদ্যালয়ের সাবেক সভাপতি ডা. জিল্লুর রহমান বলেন, দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক না থাকায় বিদ্যালয়টির প্রশাসনিক নেতৃত্ব কার্যত শূন্য হয়ে পড়েছে। সহকারী প্রধান শিক্ষকও অসুস্থ থাকায় শ্রেণি কার্যক্রম, একাডেমিক তদারকি ও প্রশাসনিক কাজ স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হচ্ছে না। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।
তারা বলেন, চৌগাছার অন্যতম প্রাচীন ও সুনামধন্য এই সরকারি বিদ্যালয় থেকে হাজার হাজার শিক্ষার্থী পড়াশোনা শেষ করে দেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্ব পালন করছেন। এমন একটি প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন প্রধান শিক্ষক না থাকা অত্যন্ত দুঃখজনক। শিক্ষা প্রশাসনের উচিত বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত একজন যোগ্য প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া।
তাদের মতে, স্থায়ী নিয়োগে সময় লাগলে অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা হিসেবে অন্য কোনো সরকারি বিদ্যালয় থেকে একজন জ্যেষ্ঠ সহকারী শিক্ষককে বদলি করে এনে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়া যেতে পারে। এতে বিদ্যালয়ের শৃঙ্খলা, প্রশাসনিক কার্যক্রম ও পাঠদান স্বাভাবিক হবে। শিক্ষার স্বার্থে এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেন তারা।
ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক সাইদুল ইসলাম বলেন, “আমি শুধু দায়িত্বের চেয়ার পেয়েছি। প্রশাসনিক কোনো দায়িত্ব বুঝে পাইনি। এমনকি অফিসের আলমারির চাবিও আমাকে দেওয়া হয়নি। আমার শারীরিক অবস্থায় প্রায় এক হাজার শিক্ষার্থীর বিদ্যালয় পরিচালনা করা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও বলেন, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। অন্য কোনো সরকারি বিদ্যালয় থেকে একজন জ্যেষ্ঠ শিক্ষককে বদলি করে এনে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব দেওয়ার অনুরোধও করা হয়েছে।
সহকারী প্রধান শিক্ষক শফিকুল ইসলামের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “প্রধান শিক্ষক থাকতেই আমি অসুস্থ হয়েছি। এরপর থেকেই আর বিদ্যালয়ে যাওয়া হয়নি। বিদ্যালয়ের কোনো কিছুই আমার কাছে নেই। তাছাড়া বিদ্যালয়ের অফিস বুঝে নেওয়ার দায়িত্ব বর্তমান প্রধান শিক্ষকের।”
উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এসএম বজলুর রশিদ বলেন, বিদ্যালয়ের অফিস ও শ্রেণি কার্যক্রম কিছুটা এলোমেলো আছে। বিদ্যালয়টিতে একজন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ করা অত্যন্ত জরুরি। তবে কবে প্রধান শিক্ষক পাওয়া যাবে, তা এখনই সঠিকভাবে বলা যাচ্ছে না।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা ইসলাম বলেন, বিদ্যালয়ে দ্রুত একজন প্রধান শিক্ষক নিয়োগ দেওয়া প্রয়োজন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন শিক্ষা কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে।