বর্তমান ডিজিটাল যুগে তথ্যের কোনো অভাব নেই, তবে সেই তথ্যের কতটা সত্য আর কতটা গুজব, তা যাচাই করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে স্বাস্থ্য সচেতনতার ক্ষেত্রে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভুল তথ্যগুলো নারীদের মধ্যে অহেতুক ভীতি ও উদ্বেগের সৃষ্টি করে। স্তন ক্যানসারের মতো সংবেদনশীল বিষয়েও এমন অনেক ভ্রান্ত ধারণা প্রচলিত আছে, যা বছরের পর বছর ধরে নারীরা বিশ্বাস করে আসছেন।
সম্প্রতি ভারতীয় সংবাদমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমসের একটি প্রতিবেদনে ক্যানসার বিশেষজ্ঞ ও সার্জন ড. ক্রিস্টিন লাই স্তন ক্যানসার নিয়ে এমন কিছু বহুল প্রচলিত মিথ বা ভুল ধারণা ভেঙে দিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেছেন যে, ভয় কখনো ক্যানসার প্রতিরোধ করতে পারে না, বরং সঠিক ও তথ্যভিত্তিক জ্ঞানই পারে সচেতনতা বাড়াতে। ড. লাইয়ের মতে, ইন্টারনেটে প্রচারিত তথ্যের ওপর অন্ধভাবে বিশ্বাস না করে বিজ্ঞানসম্মত প্রমাণের ওপর নির্ভর করা উচিত।
নিচে স্তন ক্যানসার নিয়ে ড. ক্রিস্টিন লাইয়ের আলোচিত ৮টি ভুল ধারণা ও সেগুলোর প্রকৃত সত্য তুলে ধরা হলো:
১. অন্তর্বাস বা ব্রা পরলে কি ক্যানসার হয়?
অনেক নারীই মনে করেন দীর্ঘক্ষণ ব্রা পরে থাকা, বিশেষ করে আন্ডারওয়্যার ব্রা বা ব্রা পরে ঘুমানো ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়। কিন্তু ড. লাই স্পষ্টভাবে জানিয়েছেন, অন্তর্বাসের সাথে ক্যানসারের কোনো বৈজ্ঞানিক যোগসূত্র নেই। ক্যানসার অস্ট্রেলিয়ার তালিকাতেও এটিকে ঝুঁকিমুক্ত হিসেবে গণ্য করা হয়েছে।
২. কফি পান ও স্তনের ব্যথা
অনেকে মনে করেন কফি খেলে স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ে। ক্যাফেইন পানের ফলে কিছু নারীর স্তন কিছুটা নরম বা পিণ্ডাকৃতির মনে হতে পারে, তবে এটি মূলত হরমোনের পরিবর্তনের কারণে হয়, ক্যানসারের জন্য নয়। তাই ক্যানসারের ভয়ে প্রিয় পানীয়টি ছেড়ে দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই।
৩. চিনি কি ক্যানসারের খাবার?
ইন্টারনেটে ছড়িয়ে পড়া একটি বড় মিথ হলো, চিনি ক্যানসারকে পুষ্ট করে। ড. লাইয়ের মতে, আমাদের শরীরের প্রতিটি কোষ গ্লুকোজ বা চিনির ওপর নির্ভর করে চলে। কেবল চিনি বর্জন করলেই ক্যানসার কোষ ধ্বংস করা সম্ভব নয়, কারণ এটি সুস্থ কোষগুলোকেও প্রভাবিত করবে। কার্বোহাইড্রেট বা চিনি নিয়ে অযথা আতঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
৪. সয়াবিন জাতীয় খাবারের প্রভাব
সয়াবিন, টফু বা সয়া মিল্ক স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়ায়—এমন ধারণা প্রচলিত থাকলেও আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞান ভিন্ন কথা বলছে। সয়াবিনে থাকা উদ্ভিজ্জ ইস্ট্রোজেন শরীরের প্রাকৃতিক ইস্ট্রোজেনের মতো কাজ করে না এবং কিছু গবেষণায় এটি স্বাস্থ্যের জন্য ইতিবাচক হিসেবেও দেখা গেছে।
৫. স্তনের আকার ও ক্যানসার ঝুঁকি
অনেকে বিশ্বাস করেন স্তনের আকার বড় হলে ক্যানসারের ঝুঁকি বেশি থাকে। তবে ড. লাই জানিয়েছেন, স্তন ছোট বা বড় হওয়ার ওপর ক্যানসারের ঝুঁকি নির্ভর করে না। এটি একটি শারীরিক গঠনগত বিষয় মাত্র।
৬. আঘাত বা ক্ষত থেকে ক্যানসার
হঠাৎ কোথাও পড়ে যাওয়া বা গাড়ির সিটবেল্ট থেকে স্তনে কোনো আঘাত পেলে অনেকেই ক্যানসারের ভয় পান। ড. লাই জানান, আঘাতের ফলে স্তনে সাময়িকভাবে কোনো পিণ্ড বা দলা তৈরি হতে পারে যা নিরাময়যোগ্য, তবে এটি ক্যানসারে রূপান্তর হওয়ার কোনো প্রমাণ নেই।
৭. গর্ভপাত বা মিসক্যারেজ
১৬টি দেশের প্রায় ৮৩ হাজার নারীর ওপর পরিচালিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, গর্ভপাতের সাথে স্তন ক্যানসারের কোনো সম্পর্ক নেই। এটি একটি সম্পূর্ণ ভুল ধারণা যা কেবল মানসিক চাপ বৃদ্ধি করে।
৮. আইভিএফ বা প্রজনন চিকিৎসা
অনেকের ধারণা আইভিএফ চিকিৎসায় ব্যবহৃত হরমোনগুলো স্তন ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়াতে পারে। ড. লাইয়ের মতে, এই চিকিৎসার সাথে ক্যানসারের ঝুঁকির কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ এখনো মেলেনি, তাই যারা আইভিএফ করার কথা ভাবছেন তাদের দুশ্চিন্তার কিছু নেই।
শেষ কথা
ড. ক্রিস্টিন লাইয়ের ভাষায়, ‘আমার লক্ষ্য হলো নারীদের মন থেকে ভয় দূর করা, ভয় বাড়িয়ে দেওয়া নয়’। স্বাস্থ্য নিয়ে কোনো সন্দেহ থাকলে সোশ্যাল মিডিয়ার তথ্যে বিভ্রান্ত না হয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া এবং নিয়মিত চেকআপ করানোই সুস্থ থাকার প্রধান উপায়। ভুল তথ্যের মায়াজাল ছিন্ন করে সঠিক জ্ঞানে সচেতন হওয়াই হোক আমাদের অঙ্গীকার।