মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের চীন সফরের সময় ঘনিয়ে আসছে। ইরানের সঙ্গে ইসরাইল ও যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ায় পিছিয়ে যাওয়া সফরটি আগামী ১৪-১৫ মে হওয়ার কথা। এই সফরে চালকের আসনে থাকবে চীন এমনটাই বলছেন বিশ্লেষকরা। দুর্লভ এই মুখোমুখি বৈঠককে পারস্পরিক সম্পর্ক স্থায়ীভাবে জোরদার করার সম্ভাবনা হিসেবে দেখছে বেইজিং। চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং এই বৈঠককে অত্যন্ত গুরুত্ব দিচ্ছেন। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান অস্থিরতা বিশেষ করে ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত চীনের জন্য এক ধরনের কূটনৈতিক সুযোগ তৈরি করেছে। এতে ওয়াশিংটনের দরকষাকষির অবস্থান কিছুটা দুর্বল হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র চেয়েছিলো চীনের প্রভাব কমাতে। তারা ভেনেজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে তুলে নেয়ার পর ইরানে আক্রমণ করে চীনের বলয়কে ছোট করে আনতে চেয়েছিলো।
কিন্তু ইরান যুদ্ধ এখন তাদের গলার কাঁটা হয়ে দেখা দিয়েছে। যুদ্ধ যত সহজে শেষ হবে ভেবেছিলেন ট্রাম্প, তা না হওয়ায় এবং হরমুজ প্রণালিতে ইরানের শক্ত অবরোধ বজায় থাকায় বিশ্বে যুক্তরাষ্ট্রের ভাবমূর্তি ক্ষূন্ন হচ্ছে। তারা মিত্রদের আস্থা হারাচ্ছে। এতে চীনকে বিশ্বের অনেক রাষ্ট্র নিরাপদ এবং টেকসই বিকল্প হিসেবে ভাবছে। তবে বেইজিং সতর্ক অবস্থানও বজায় রেখেছে। কারণ, ইরানের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়ন চীনের জন্য সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বাণিজ্যিক এবং সামরিক ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রতিদ্বন্দ্বী হবার পরও উভয়দেশের মধ্যে অর্থনৈতিক সম্পর্ক অত্যন্ত বিস্তৃত। বিশেষজ্ঞদের মতে, ইরান যুদ্ধ ঘিরে সৃষ্টি হওয়া পরিস্থিতি এই বৈঠকের মূল লক্ষ্যকে জটিল করে তুলেছে। চীন ভ্রমণের পর ট্র্রাম্প ফের ইরানে আক্রমণ করলে তা ভুল বার্তা দিতে পারে চীনের মিত্রদের। এছাড়াও হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকলে চীনের জ্বালানি সরবরাহ মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হতে পারে, যা তাদের জন্য বড় উদ্বেগের বিষয়। চীনের জ্বালানি তেল-গ্যাসের এক তৃতীয়াংশ এই পথ দিয়ে আমদানি করা হয়। অন্যদিকে, ট্রাম্পও এই সফরকে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভাবছেন। যুক্তরাষ্ট্রে আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে তিনি ভোটারদের সামনে বড় ধরনের অর্থনৈতিক সাফল্য দেখাতে আগ্রহী। চীনের কাছে কৃষিপণ্য ও বিমান বিক্রির মতো চুক্তি তার পক্ষে ইতিবাচক বার্তা দিতে পারে ভোটারদেরকে যা রিপাবলিক পার্টির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
চীন এই সুযোগে নিজেদের স্বার্থ আদায়ে চাপ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে তাইওয়ান ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান পরিবর্তন, হাই টেক পণ্য রপ্তানিতে বিধিনিষেধ শিথিল এবং চীনা কোম্পানিগুলোর ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহারের মতো বিষয়গুলো সামনে আনতে পারে বেইজিং। চীনে নিযুক্ত ইউরোপীয় ইউনিয়ন চেম্বার অফ কমার্সের সাবেক সভাপতি এবং ডিজিএ অলব্রাইট স্টোনব্রিজ গ্রুপের অংশীদার ইয়র্গ ভুট’কে ইরান যুদ্ধকে ইঙ্গিত করে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র জয় ছাড়া লড়াই করছে, চীন লড়াই ছাড়া জিতছে। তিনি আরও বলেন, জ্বালানির দামের কারণে (চীনারা) অবশ্যই বাজেভাবে প্রভাবিত হচ্ছে। কিন্তু একই সাথে, চীন এই পরিস্থিতি থেকে অনেক লাভবানও হচ্ছে।
তিনি চীনের নবায়নযোগ্য জ্বালানির নীতির কথা তুলে ধরে বলেন, চীন এমন পরিস্থিতির জন্য দেশগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রস্তুত ছিল। রাজনৈতিকভাবেও চীন আলোচনার রুমে একমাত্র পরিপক্ব পক্ষ হিসেবে হাজির রয়েছে। বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করেন, ইরান যুদ্ধ যুক্তরাষ্ট্রকে কৌশলগতভাবে ব্যস্ত করে ফেলেছে, যেখানে চীন নিজেকে স্থিতিশীল শক্তি হিসেবে তুলে ধরতে সক্ষম হয়েছে।
ফলে বৈশ্বিক রাজনীতিতে চীনের ভাবমূর্তি আরও শক্তিশালী হয়েছে। তবে সাবেক মার্কিন কূটনীতিক উইলিয়াম কেলভিন যিনি এর আগে ২০১৭ সালে ট্রাম্পের চীন সফর আয়োজনে ভূমিকা রেখেছিলো তিনি বলেন, এই সংঘাতের কারণে দুই দেশের শক্তির ভারসাম্যে বড় কোনো পরিবর্তন হয়নি। বাণিজ্য ও বিনিয়োগ সম্পর্কে উভয় পক্ষের মূল অবস্থান অপরিবর্তীত রয়েছে। এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করে অনলাইন সিএনএন। সব মিলিয়ে, আসন্ন শি-ট্রাম্প বৈঠক শুধু দুই দেশের সম্পর্ক নয়, বরং ভবিষ্যৎ বৈশ্বিক ক্ষমতার ভারসাম্য নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।

মন্তব্য করুন